স্বপ্নের দেশে
ঘুমটা ভোরের দিকেই পাতলা হয়ে গেছে, কাল সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়েছে, বৃষ্টি আর মেঘের গর্জন চলেছে ভোর অবধি। বালিশের পাশে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম ৫টা ৩৮। এত সকালে ওঠার কোনো মানেই হয় না। খবরের কাগজ, দুধ এসব আসতে আসতে ৮টা বেজে যাবে। আর এই রাতভোর বৃষ্টির মধ্যে মর্নিং ওয়াকেও যেতে খুব একটা ইচ্ছে করছে না। অগ্যতা শুয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করারও নেই।
তাই ফোনটা রেখে পাশ ফিরে শুলাম, চোখের পাতাটা লেগে আসলো মুহূর্তেই। ঠিক ঘুমোচ্ছি না, অথচ একটা আচ্ছন্ন ভাব। এটা ওটা মাথায় আসছে, হঠাৎই দেখতে পেলাম কামালদিয়ার আমাদের সেই মাটির বাড়িটা, সকাল বেলা মুরগির ঘর খুলে ডিম বের করে, দাতন নিয়ে পুকুর পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি। মা-খুড়িমারা বাড়ির ভিতরের দিকের পুকুরটায় তখন বাসন মাঝছে।
আমাদের গ্রামের বাড়িতে তখন আমরা প্রায় জনা বিশেক লোক একসাথে থাকতাম। কাকা,জ্যাঠা,ভাই-বোন সবাই মিলে সকাল থেকেই একটা জমজমাটি ব্যাপার।
হাত-মুখ ধুঁয়ে আমরা ভাই বোনেরা সবাই মিলে দাওয়ায়, পড়তে বসেছি। কিছুক্ষণ পরে মা এসে সবাইকে মুড়ি আর চা দিয়ে গেলো।
স্বপ্নে সময় অনেক দ্রুত এগোয়, তার সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে থাকে বাস্তব আর অবাস্তব দৃশ্যপট।
একটু পরেই দেখলাম, আমি বড় খুড়িমার সাথে ঘুঁটে দিচ্ছি বাউন্ডারি দেওয়ালে। এক বালতি গোবর, হাতে নিয়ে বার বার লেপ্টে দিচ্ছি দেওয়ালে। সারা বাড়ি জুড়ে হাঁসগুলো প্যাঁক্ প্যাঁক করে বেড়াচ্ছে। সেজোকাকা আর বড়দাদা মিলে গরুগুলোকে নিয়ে যাচ্ছে স্নান করাতে, গোয়ালঘর থেকে পুকুরে।
কিছুক্ষণ পর আবার দেখলাম, উঠোনে একদল লোক বসে আছে, আর উঠোনের এক কোণায় ক্ষেত থেকে সদ্য কেটে আনা ধানের আঁটি, ঢিপ দিয়ে রাখা। ঝারাই-মারাই শুরু হবে।
অন্য একটা পুকুরে জেলেরা নেমেছে, মাছ ধরতে। আমরা পাঁচ-ছয় জন বাড়ির বাচ্চা ঘাটে দাঁড়িয়ে সেই মাছ ধরা দেখছি মহানন্দে।
তারপর মাঝের বেশকিছু দৃশ্য আবার অবলুপ্ত। তাই যেটুকু মনে পড়ছে তাই লিখে যাচ্ছি পরপর-
গ্রামে আমাদের নিজেস্ব মাঠে বছরে দু’বার করে ফুটবল ট্যুরনামেন্ট হতো।
দেখলাম আমরা সবাই খেলার মাঠে খেলা দেখছি, কেউ বসে, কেউ দাঁঁড়িয়ে, কেউ গাছে ঝুলে। পুরো গম গম করছে মাঠ চত্ত্বর। আচমকা কোথা থেকে ছোটকাকা এসে আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। মাঠে আমার পাশে আমার খুড়তুতো ভাই নীহার দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাকে এভাবে চলে যেতে দেখে ও বোধহয় অবাকই হলো, কাকার সাথে যেতে যেতে আমি পিছনে ফিরে ওর দিকে তাকালাম, ও নিজেও কিছু বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। দেখতে পাচ্ছিলাম, আস্তে আরও দূরে সরে যাচ্ছে সব, পিছনে চলে যাচ্ছে আমার গ্রাম, আমার গ্রামের বাড়ি, গ্রামের মেঠো পথ, আমার পরিবার, ছোটবেলার সঙ্গী সাথী সবকিছু, আর আমি ক্রমে এগিয়ে যাচ্ছি, নিজের চেনা বৃত্ত থেকে অচেনার দিকে। কষ্ঠ হচ্ছে খুব কষ্ঠ, তবু কাঁদছি না, রাগ হচ্ছে মনে মনে, কিন্তু বোঝানোর মতো কেউ নেই।
দৃশ্যটা শেষ হতে না হতেই বেলের আওয়াজ পেয়ে ঘুমটা ভেঙে গেলো। ততক্ষণে সাড়ে আটটা বেজে গেছে। উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম মালতী এসেছে। খবরের কাগজ, দুধের প্যাকেট নিয়ে মালতী ঘরে ঢুকলো।
স্বপ্নটা ভাঙলো ঠিকই, তবু ঘোরটা কাটলো না। ব্রাশ নিয়ে রেডিওটা ওন করলাম। ঘুম থেকে উঠে রেডিও চালানো আমার রোজকার অভ্যেস।
জানলা খুলতে খুলতে দাঁড়িয়ে পড়লাম জানলার সামনেই, কানে ভেসে আসছে -“পুরানো সেই দিনের কথা,............সেকি ভোলা যায় ” রবি ঠাকুরের সেই বিখ্যাত গান।
চোখের সামনে সিনেমার মতো যেন, আবার ভেসে উঠলো সেই হারানো দিনগুলো, সাত বছর বয়সে ছোটকাকার হাত ধরে চলে এসেছিলাম এপাড়ে, ভারতে। তারপর থেকে এখানেই বেড়ে ওঠা, এখানেই পরিচিতি প্রাপ্তি, এখানেই টু বিএইচকে তে নিজেকে আঁটিয়ে নিয়ে গুটিয়ে ফেলা। তবু বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় পৌঁছে এখনও স্মৃতিতে অতটাই উজ্জ্বল সত্তরের দশকের সেই উন্মুক্ত পরিমন্ডলের ছেড়ে-আসা বৃত্ত।
হুমায়ূন আহমেদের ভঙ্গিতে “ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো” বলতে বলতে পিছনে ফেলে-আসা সেই ভালো থাকারা এখন ঠিক কতটা ভালো আছে- তার খবর সত্যিই এখন আর জানা নেই। শুধু আছে কিছু স্মৃতি, আর অনেকটা অভাব, যাদের গুছিয়ে রেখে এখনও লড়ে যাচ্ছি আমার নিজের ভালো থাকার, নিজের অস্তিত্বের লড়াইটা।।
©দীপশ্রী গুহ
Comments
Post a Comment