নাটকের জন্য
[ট্রেন প্লাটর্ফম ছেড়ে যাওয়ার আওয়াজ,আসতে আসতে আলো পড়ছে, মঞ্চের উপর।চৈত্রের গরমে লোকজন নেই স্টেশনে। বাঁ দিকে কাঠের চেয়ারে, ২৫-২৬ বছর বয়সী এক যুবতীকে, বসে, পা নাড়াতে নাড়াতে ফোনে স্ক্রল করতে দেখা যাচ্ছে। মঞ্চের সামনের দিকে আলো পড়েছে, নীচ থেকে মঞ্চের উপর লাফিয়ে উঠে আসলো সালোয়ার কামিজ পরা একজন পুরুষালী চেহারার মানুষ, যাকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। পরনের ওড়না দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে চেয়ারে মেয়েটার পাশে গিয়ে বসলো সে।]
কাউকে উদ্দেশ্যে না করে নিজে নিজেই বললো-
-উফ্ মরার মতো গরম পড়েছে! বাপরে বাপ !
[পাশের মেয়েটি তখনও ফোনর দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির দিকে তাকিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষটি বললো]
-কটা বাজলো গো দিদি?
মাথা না তুলেই মেয়েটি সাড়া দিল-
-২ টো ২৮।
-তালে তো এখনো খানিক দেরী লাগাবে ট্রেন আসতে।
-হুম ওই ১৬-১৭ মিনিট মতো।
-জল আছে গো তোমার কাছে? আজগে এতো দেরি হয়ে গেলো বেড়াতে, জল নিতেই ভুলে গেছি। তেষ্টায় জীবনটা এক্কেরে বেড়িয়ে যাচ্ছে গো।
-হ্যাঁ আছে। দাঁড়াও দিচ্ছি।
[এই বলে ব্যাগ থেকে জল বেড় করে হাতে দিলো মেয়েটি। বোতল টা নিয়ে আলগোছে জল খেতে খেতে জামায় খানিকটা জল পড়লো অন্য মানুষ টির]
-উফ্ বাঁ-চা-লে দিদি। তুমি কতদ্দূর যাবে গো?
-বিরা
-ওহ, আমি তার আগেই নেমে যাবো, অশোকনগর।
-আচ্ছা
-মাঝে আর একবার দেবে জলটা যদি চাই?
-হ্যাঁ নিশ্চয়ই একি। কেনো দেব না!
-নাহ্ আসলে লোককে বলতেও তো ভয় লাগে এখন।
[ফোনটা এবার বন্ধ করে তাকিয়ে মেয়েটি বললো-]
-কেন?
-কেন আবার? সবার যা ভা-ব, কি আর বলবো তোমায়? আর তা বাদে আমরা তো আর সাধারণ মানু-ষ নইগো, তোমাদের মতো। তাই লোকের ও তেমনি ব্য-বহার। আমাদের দেখলে তো এমনি করে যেন আমরা রাক্ষস খোক্ষস।
-কিছু মনে করো না তোমরাও খুব একটা ভালো ব্যবহার করো না সবার সাথে হ্যাঁ? দেখি- তো এক-একজন কিভাবে টাকা তোলে।
-জানি গো। কিন্তু বলতো দিদি, তোলা না পেলে খাবো কি? রাতে বস্তিতে ফিরে গুরুমা তো তাঁর আদায়টা ঠি-ক বুঝে নিবে। সব যদি দিয়ে দি তা-লে আমাদের কি থাকে?
-তাই বলে তোমাদের ব্যবহার সত্যিই খুব খারাপ। তোমরাও তো কম খিস্তিখেউড় করোনা রাস্তাঘাটে।
-তা হয়তো করি। তোমাদের মতো শিক্ষে-দীক্ষে কি আমাদের আছে গো? যবেদ্দিয়ে জ্ঞান-বুদ্ধি হয় এসব দেখেই তো বড় হ-ই। আমাদের মা-বাপ বলতে ওই গুরুমাই সব। ছোট থেকে বড় করে, নাচ-গান শেখায় তারপর ১৫-১৬ বছর বয়স হলে ছেড়ে দেয়, বাইরে। আমাদের তো এভাবে লাঠি-ঝাঁটা খেতে খেতে দিন কাটে গো দিদি। আর পেটের জ্বালায় তখন আর ভালো কথা মাথায় আসে না গো।
-তোমরা এরকম বেঁছে নাও তাই। কেনো অন্য কাজও তো করা যায়। চেষ্টা করলেই মূলস্রোতে ফেরা যায়।
-হা হা হা এসব জ্ঞানের কথা গো দিদি। আচ্ছা বলো তো তুমি যে এত বড়ো বড়ো কথা ফোটাচ্ছো তোমার বাড়িতে এক বেলা ঠিকে কাজের লোক হিসেবে রাখতে পারবে, আমায়? আমাদের? এই বালের ভদ্র সমাজ ঠিকে ঝি হিসাবে একটা হিজড়ে কে মেনে নিতে পারবে তোমরা?
-কাজের লোক কেন? যথাযথ শিক্ষিত হয়ে চাকরি করাও সম্ভব।
-শোন গো দিদি। দু’বেলা ভরপেট খেয়ে, যথাযথ সম্মান আর পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষেরা অনেক বড়ো বড়ো বাতেলা দিতে পারে। আমাদের যুদ্ধটা আরও অনেকটা কঠিন গো। দু-চারটে হিজড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, এগিয়ে আসতে পেরেছে বলে ভেবো না সব্বাই সমান। আর শিক্ষা? কোথায় পাবো বলতো? বাপ-মা যাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে, পাঁকে ফেলে দিয়েছে, কোথায় পাবে তারা এত জোড়? কে দাঁড়াবে তাদের পাশে?
-কেন কলেজে তো এখন ট্রান্সজেন্ডার অ্যালাউড। আর সরকার থেকেও তো ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল শুনেছিলাম।
-কলেজ? হা হা হা। দিদি গো কলেজে উঠতে গেলে পেরাইমারি আর হাই স্কুল পেরোতে হয়। হিজড়েদের পড়ানোর, আর পড়ার মতো ব্যবস্থা আর কাঠামো আছে আমাদের দেশে? কলেজের কথা বলতেছো তুমি?
আর সরকার, ভোটের আগে দু-চার দিন তেল মেরে ফুরুৎ। তোমরা ভালো থেকো গো দিদি। আমাদের মতো ক-পাল, যেন শোত্তুরও না হয়। মরণটাই আমাদের কাছে একমাত্তর সুখ, বুঝলে কিনা!
[কথা শেষ হলো দুজনেরই। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দুজনেই তৈরী হলো ট্রেনের জন্য, মেয়েটি মাথা নীচু করে, আর তৃতীয় লিঙ্গের মানুষটি মাথা ওপরে করে স্থির হল। ট্রেনের শব্দের সাথে, মঞ্চের আলো আসতে আসতে নিভে যাচ্ছে।]
©দীপশ্রী গুহ
Comments
Post a Comment