এনকাউন্টার
(১)
পেপারে আর খবরের চ্যানেলগুলোতে বেশ কিছুদিন ধরেই বিভিন্ন যায়গায় সন্ত্রাসবাদের ঘটনা শোনা যাচ্ছিলো দফায় দফায়।
সম্রাটের ফোনটা পাঁচ’দিন ধরে নট্ রিচেবেল।
পরশু রাতে নেহার ফোনে, একটা আননোন নাম্বার থেকে মেসেজ আসে-
“আই অ্যাম অলরাইট। টেক কেয়ার। সি ইউ সুন। ”
রাতে খেতে বসে, সবাইকে আশ্বস্ত করে নেহা বললো,
-চিন্তার কিছু নেই, সম্রাট ফিরে আসবে কিছুদিনের মধ্যেই। নিশ্চই কোন কারনে ফোনটা বন্ধ কিংবা খারাপ হয়ে গেছে। ১১ বছর প্রেমের পর, তিনবছর হলো নেহার সাথে সম্রাটের বিয়ে হয়েছে। একসাথেই কলেজ পাশ করে দুজনে। তারপর সম্রাট আই.বি'তে জয়েন করে আর নেহা একটা বেসরকারী স্কুলে চাকরি পায়।
বৌভাতের পরেরদিনই জরুরি তলবে চলে যেতে হয় সম্রাট'কে। যাওয়ার আগে নেহার কপালে চমু খেয়ে সম্রাট বলেছিলো,
-নেহা,পাশে থেকো। তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই করতে পারবোনা। তুমি আমার সাহস, আর তুমিইইই আমার আত্মবিশ্বাস।
তারপর থেকেই সম্রাটের সংসারের দায়িত্ব আর চাকরি সামলে নেহা আরও কিছুটা মানসিকভাবে শক্ত হয়ে উঠেছে। ছোটবেলায় নিজের চোখের সামনে বাবা-মায়ের মৃত্যু আর তারপর বড়ো ব্যবসায়ীর মেয়ের, কাকার টানাটানির সংসারে অত্যাচার সহ্য করে, এককোণে পরে থাকতে থাকতে বয়সের থেকে অনেকটাই বেশি ম্যাচিওর হয়ে উঠেছিল নেহা। তাই সম্রাটের এরকম নিরূদ্দেশ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় নেহা আর বিচলিত হয়না।
এঁটো থালাবাসন, তুলতে তুলতে কলিংবেল বেজে উঠলো। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।
-এত রাতে কে এলো বৌমা?
-দেখছি বাবা।
হাত ধুয়ে দরজা খুলতেই চমকে গেলো নেহা।
-তুমি? এত রাতে?
-কে আসলো?
-বাবা, সম্রাট।
সবাই যে যার ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে এলো। কেউ কিছু প্রশ্ন করার আগেই নেহা বললো,
-পুরো ভিজে গেছো ফ্রেশ হয়ে নাও। এখন অনেক রাত হয়ে গেছে কাল সকালে সব প্রশ্নের উত্তর দিও। মা...., বাবা’কে নিয়ে এখন ঘরে যান।
নেহাকে এই জন্যেই সম্রাট এতো ভালোবাসে, পরিবারের কঠিন প্রশ্নের মুখে পরার আগেই তাকে বুলেটপ্রুফ্ জ্যাকেট এর মত সেভ্ করে দেয় নেহা।
(২)
সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে, সবাই ব্রেড-বাটার, ডিমের পোচ আর জ্যুস খেতে খেতে সম্রাটের কাছে এতদিনের আত্মগোপনের বানানো বিবরণ সবিস্তারে শুনছিলো। নেহা স্কুলের জন্য তাড়াতাড়ি টিফিন গুছিয়ে বেড়িয়ে পরে। দুপুরে খাওয়ার পর সম্রাট নেহার ফোনটা নিয়ে কাকে যেনো একটা ফোন করলো।
- ইয়েস্। এভরিথিং ইজ্ গোয়িং ওয়েল টিল নাও। ইয়েস্.... ডেফিনেটলি। আই উইল টেক কেয়ার। বাই।
ফোনটা রেখে নেহাকে জড়িয়ে ধরলো সম্রাট।
-উমমমম! কতদিন তোমার গায়ের গন্ধটা পাইনি বলতো?
-ঢং!
বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো নেহা। এবার নেহার কানের খুব কাছে গিয়ে, সম্রাট যা বললো তাতে নেহার হাড়ের মধ্যে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেলো।
- বি রেডি নেহা। নাও উই হ্যাভ টু টেক আওয়ার পজিশন। তোমার গিফ্টটা আলমারির লকারে আছে। আমাদের এবার আর একটু কেয়ারফুল’ই এগোতে হবে।
(৩)
সন্ধ্যেবেলায় চায়ে চুমুক দিতে দিতে, সম্রাট বললো,
-ভাবছি নেহা কে নিয়ে একটু কোথাও ঘুরে অাসবো। আমাদের তো বিয়ের পর হানিমুনেও যাওয়া হয়নি কোথাও।
-ওমা! এতে আবার ভাবার কি আছে? আমি আর তোর বাবাও তো প্ল্যান করছিলাম শিরডি যাবো, আমাদের যোগাশ্রমের দলটার সাথে।
-কাল একবার বেরোতে হবে, এত তাড়াতাড়ি কিছু করা যায় কিনা দেখি। সম্রাট ল্যাম্পসেডটা নেভাতেই, নেহা দেখতে পেলো জানলার বাইরে একটা ছায়া সরে গেলো।
পরের দিন দুপুরে, নেহা বাড়ি ফিরলে, সম্রাট বললো,
-অল্ সেট ডার্লিং। নেক্সট্ উইক বুধবারের টিকিট পেয়েছি। রির্টান রবিবার। সোমবার থেকে ইওর জার্নি উইল স্টার্ট।
বৃহস্পতিবার সকালে হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে, ওরা বেরিয়ে পড়লো সাইড সিনে। থ্রি নাইট ফোর ডে’র ট্যুর শেষ করে রবিবার রাতে ট্রেন। নেহা বরাবরই ফটো তুলতে খুব ভালোবাসে,প্ল্যানমাফিক শনিবারের সাইড সিনে গিয়ে পোজ্ দিয়ে ফোটো তুলতে তুলতেই ঘটলো ঘটনাটা। হঠাৎই পা ফস্কে পরে গেলো নেহা। পাহাড়ের গা বেয়ে গড়াতে গড়াতে তারস্বরে চিৎকার করতে থাকলো নেহা,
-সম্রাট........ বাঁ....চাও!
(৪)
একসপ্তাহ পরে, উইল চেয়ারে করে বাড়ি ফিরলো নেহা। দরজা খুলতেই নেহাকে দেখে, হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো সম্রাটের মা। ধীরে ধীরে সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়লো সম্রাটের কাঁধে। পুরো সংসারের বোঝা নিজে হাতে সামলানো নেহা এখন জল খেতে হলেও সম্রাটের উপর ভরসা করতে হয়।
সেদিন সন্ধ্যে প্রায় আটটা। বাবা-মা হাঁটতে বেরোয় সন্ধ্যে হলেই ফিরতে ফিরতে রাত ন’টা। সম্রাট তখন রান্নাঘরে ছিলো। নেহা বিছানায় বসে গল্পের বই পরছিলো। হঠাৎ টের পেলো জানলার বাইরে, খুব নিচু গলায় কিছু কথাবার্তা বলার শব্দ।
হঠাৎ কলিংবেলটা বেজে উঠলো। সম্রাট দৌড়ে গেলো দরজা খুলতে। দরজা খুলেই চিৎকার করে উঠলো সম্রাট। নেহা আর দেরী না করে ফোনটা’কে হাতে নিয়ে দুবার শেক্ করে নিলো। বিছানা থেকে নেমে, হাতের ব্যন্ডেজটা খুলে, আলমারির লকার থেকে বের করে নিলো, সম্রাটের দেওয়া আ্যনিভারসরির গিফ্টটা, এ.কে ফর্টিসেভেন। বাইরে এসে, সামনের দিকে তাক করে, পিছনে টানলো বন্দুকের ট্রিগারটা। মুহূর্তে সম্রাটের মাথা থেকে তাক করা বন্দুকটা সরে যেতে থাকলো, মাটিতে নিমেষে লুটিয়ে পড়লো রকির দেহটা। নেহার ফোন থেকে এমারজেন্সি মেসেজ পেয়েই, ১০ মিনিটের মধ্যে বাড়িটা ঘিরে ফিরলো পুলিশ-বাহিনী।
স্মাগলিংয়ের ব্যবসায় হাত না মেলানোর জন্য নেহার বাবা-মাকে খুন করায় রকি, আর জালিয়াতি করে গ্রাস করে ওদের সব সম্পত্তি। কিছুদিন আগেই রকির একমাত্র ভাই মন্টির এনকাউন্টারের সিক্রেট মিশনে মোতায়েন ছিলো সম্রাট। সম্রাটের বাড়ি ফেরার পর থেকেই রকির দল নজর রাখছিলো ওদের বাড়ির ওপর। সন্দেহ এড়াতেই, সিমলায় নেহার আকস্মিক এ্যক্সিডেন্টটা প্রি-প্ল্যান্ড করা হয়। লোক চক্ষুর আড়ালে, স্কুলে চাকরির নামে শুটিং এর ট্রেনিং নিতো নেহা।
-ওয়েল ডান নেহা! আওয়ার প্ল্যান হ্যাজ সাকসেসফুল!
বরান্দায় সম্রাটের কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে ফেললো নেহা। আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বললো,
-এতদিনে তোমাদের খুনের বদলা নিতে পারলাম বাপি-মামুনি। ভালো থেকো তোমরা।।
Comments
Post a Comment