অন্ধকারের বেলোয়ারী
বহুদিন পর আজ বিকেলে ভাতঘুম সেরে একটু হাঁটতে বেরোলাম। মোড়ের মাথায় মনসা মন্দিরের কাছেই দেখা হলো বল্টুর সাথে। বল্টু আমার ছোটবেলার বন্ধু, একসাথে খেলাধুলা করতাম।
ওর সাথে বেশকিছুক্ষণ, কেমন আছি? কেমন চলছে? এইসব যাবতীয় কথা হলো। এরইমধ্যে হঠাৎ করে বল্টু বললো,
-জানিস গুড়দাদুর অবস্থা শুনলাম নাকি খুব খারাপ! কিছুই মনে নেই, কাউকে নাকি চিনতেও পারে না এখন আর!
গুড়দাদু ছিলো আমাদের ছোটবেলার হিরো। বিকেলবেলা মাঠ থেকে, খেলাধুলো সেরে বাড়ি ফেরার পথে, আমরা একবার করে ঢুঁ মারতাম গুড়দাদু ওরফে কানাইলাল সিকদারের বাড়ি। ছেলেপুলে নেই, আত্মীয় পরিজন'ও তিনকূলে কেউ নেই, অন্তত আমরা'তো দেখিনি, থাকার মধ্যে একমাত্র ওই বউ। গুড়দাদু কোন এক সরকারি অফিসে কেরানির কাজ করতো। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে, উঠোনে বসে আমাদের গল্প শোনাতো। আর গল্পের শেষে, আমাদের সবাইকে একটুকরো করে পাটালি গুড় দিতো। আর আমরাও মহানন্দে সেই গুড় খেতে খেতে বাড়ি ফিরতাম। সেই থেকেই ওঁর নাম গুড়দাদু।
আজ বহুদিন পর আবার গুড়দাদুর বাড়ি গেলাম। সন্ধ্যে হলেই পাওয়ার কাট, এখন একটা নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুড়দাদুর বউ, একটা হ্যারিকেন জ্বালিয়ে টেবিলে রাখলো। বিছানায় গুড়দাদু পা মেলে বসে, পাশের জানলাটা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলো। আমি টেবিলের পাশে রাখা চেয়ারটা টেনে নিয়ে, বিছানার কাছে গিয়ে বসলাম। দিদার সাথে কথাবার্তায় যা বুঝলাম,পারকিনসন'স এর কারণে, পারমানেন্ট ডিমেনশিয়া। হ্যারিকেনটা টেবিলে রাখায়, দাদু একবার আগুনটার দিকে ফ্যাকাশে চোখে তাকালো। হ্যারিকেনের আলোয় ভাঙা গাল আর গর্তের ভিতর ঢুকে যাওয়া চোখদুটো দেখতে দেখতে,
ওঁকে ডেকে একবার জিজ্ঞেস করলাম,
- কি চিনতে পারছো, গুড়দাদু?
আমি সজল। ছোটবেলায় আমাদের সাথে কত্ত গল্প করতে তুমি?
আমার কথা শুনে গুড়দাদু, একবার হতবম্বের মতো আমার দিকে তাকালো, বোধহয় কিছু মনে করার চেষ্টা করলো। তারপরক্ষণেই চোখ নামিয়ে উদাস ভাবে আবার জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে রইলো। চেয়ারে বসে আমিও একবার তাকালাম বাইরের দিকে। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে, যেন মুড়ে গেছে বাইরে টা, ঠাহর করা যাচ্ছে না আর কিছুই। তবুও গুড়দাদু তাকিয়ে আছে, হয়তো অপেক্ষায় আছে, অন্ধকার ভেদ করা কোনো আলোক কণিকার।
©দীপশ্রী গুহ
Comments
Post a Comment