হেনরি দ্বীপের উপকথা
ছোটবেলায়, “হাঁসুলী বাঁকের উপকথা” ছিলো আমার খুব পছন্দের গল্পের বই। তাই সারাক্ষণই যেন ডুবে থাকতাম সেই পল্লীগাঁয়ের স্মৃতির ভিতরে। আসলে তারাশঙ্কর বন্ধ্যোপাধ্যায়’এর সেই অভূতপূর্ব রচনার অনন্য তৃপ্তিই বোধহয় আমাকে বারবার টেনে নিয়ে যেত সেই স্বপ্নের দেশে।
বড়ো হয়ে সময়ের সাথে সাথে গল্প পড়ার অভ্যেস কমে গেলেও মাঝেমাঝেই মনে পরে পুরোনো দিনগুলোর কথা। আর হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে আবার সেই স্বপ্নের রূপসাগরে।
আর এরকমই একটা রূপসাগরের হদিশ আমি পেয়েছিলাম গতবছর। সেই অভিজ্ঞতাই, ভাগ করে নিতে এসেছি।
খুব কমদিনের মধ্যে- পড়াশোনা কিংবা চাকরির একঘেঁয়েমি মন্দলাগা কাটাতে পশ্চিমবঙ্গের একেবারে শেষ কোণায় অবস্থিত সাগরাচ্ছন্ন “হেনরি আইল্যান্ডে’র” জুড়ি মেলা ভার।
আমরা গতবছর তাই খুব কম দিনের মধ্যেই প্ল্যান করে বেড়িয়ে পরেছিলাম কয়েক ছটাক তৃপ্তির খোঁজে, গন্তব্য হেনরি দ্বীপ। তারিখটা ছিলো ১লা নভেম্বর,২০১৯,শুক্রবার। মাত্র তিনদিনের এই উইকেন্ড ট্রিপ আমার কাছে সারাজীবনের একটা অ্যাসেট বলা যায়।
শুক্রবার সকাল সকাল আমি,আমার মা ও আমার আর এক বন্ধু ও তার পরিবার, মোট ছ’জন মিলে বেরিয়ে পরলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। ট্রেনে শিয়ালদহ ও সেখান থেকে নামখানা লোকাল ধরে আমরা নামখানা গিয়ে পৌচ্ছোলাম, তখন ঘড়ির কাটা ১২ টা ছুঁই ছুঁই। স্টেশন থেকে একটা টাটাসুমো ভাড়া করে, সোজা গিয়ে উঠলাম হেনরি আইল্যান্ড। শুনেছি আগে খেয়া পার হতে হতো। তবে, এখন ব্রিজ হয়ে যাওয়ায় সে ঝঞ্ঝাট আর নেই। তাই টাটাসুমো করে হৈ-হুল্লোড় করতে করতে আমরা নামখানা থেকে বকখালি গামী রাস্তা ধরে পৌচ্ছালাম হেনরি আইল্যান্ড।
আগে থেকে আমাদের কটেজ বুক করাই ছিলো, তাই ওখানে গিয়ে সেরকম কোনো বেগ পেতে হয়নি। গাড়ি থেকে নেমে, কিছুটা পথ হেঁটে আমরা পৌচ্ছলাম নির্দিষ্ট কটেজে। সমস্ত চেকিং সেড়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে প্রায় ১টা১৫। তাই ফ্রেশ হয়ে, দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম সত্বর। তারপর একটা টোটো বুক করে আমরা গেলাম সাগর তীরে। এখানে সাগরের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট, যেহেতু মাটিতে ঢাল নেই তাই জোয়ার না হলে দীঘার মতো অত সুন্দর সমুদ্র সৈকত দেখা যায়না। যাইহোক, সাগরপাড়ে আমি, আমার বন্ধু ও তার বোন বেশ অনেকক্ষন ঘুরলাম। অনেক রঙবেরঙের শামুক আর শঙ্খ কুড়োলাম। যদিও সেই শঙ্খগুলো জ্যান্ত থাকায় বাড়ি নিয়ে আসা হয়নি শেষ পর্যন্ত।
এবার জায়গাটার একটু প্রাকৃতিক বিবরণ দিই- হেনরি আইল্যান্ডে ঢোকার মুখে আছে একটা চেক পয়েন্ট, সেখান থেকেই শুরু হয়েছে জায়গাটার অস্তিত্ব। চারিদিকে প্রচুর গাছ, তার সাথে রয়েছে প্রচুর পাখির কলরব। যা প্রথমেই সমস্ত ক্লান্তি ঘুচিয়ে দেয় যাত্রীদের। কালো পিচের রাস্তা দিয়ে আরও কিছুটা পথ এগোলেই দেখতে পাওয়া যাবে এখানকার অপরূপ সুন্দর সুন্দর কুটির গুলো। অপূর্ব সব নকসা ও কারুকার্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছে বাংলার ঐতিহ্য, যা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। আমরা যখন গেছিলাম তখনও শীত পরেনি, তবে রোদের প্রকোপও বিশেষ একটা ছিলো না। বরং মেঘলাই ছিলো আকাশ। দু-চার ফোঁটা বৃষ্টিরও দেখা পাওয়া যাচ্ছিলো মাঝে মধ্যেই। মোটামুটিভাবে একটা স্যাঁৎসেতে আবহাওয়া ছিলো, যা আরও বেশী করে দু-হাত বাড়িয়ে গ্রাস করছিলো আমাদের, এখানকার সৌন্দর্যে ডুব দিতে। এক মোহাচ্ছন্ন অনুভূতিতে আমরা সকলেই বাকরুদ্ধ ছিলাম।
দুপুরে সাগরতীরে জলকেলি সেড়ে বিকেল গড়ালে আমরা ফিরে এলাম কটেজে। একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যেবেলা চায়ের আড্ডায় চা-আর বেশ কয়েকরকমের তেলেভাজা খেলাম সবাই। সাথে গল্পের আসর তো ছিলোই আর তার সাথে ছিলো নেশায় মাতানো ঝিঁঝিঁর ডাক। শহুরে জীবন কাটাতে কাটাতে কটাদিন প্রকৃতির এতটা কাছাকাছি আসতে পেরে আমি বার বার হারিয়ে যাচ্ছিলাম। মনে পরে যাচ্ছিলো রবি কবির সেই অপরূপ বর্ণনা। তার রচনার মতো এই জায়গাটাও ছিলো সত্যিই এক “ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়”।
এখানে ফোনের নেটওয়ার্ক যেহেতু পাওয়া যায়না তাই নিশ্চিন্তে এবং অপার শান্তিতে কাটলো তিনদিন। রাতের খাওয়াদাওয়া সেড়ে ১০টার মধ্যে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম সকলেই। সারাদিনের ক্লান্তি আর ভরহীন মস্তিষ্ক, সহজেই আলিঙ্গন করলো ঘুমকে।
পরদিন ভোরবেলা ঘুম ভাঙলো, নানারকম বাহারি পাখির ডাকে।
ঘুমকাতুর চোখে, আমি, আমার বন্ধু ও তার বোন বেড়িয়ে পরলাম জায়গাটা আরএকটু উপভোগ করতে। এখানে সমুদ্রে যাওয়ার ঠিক আগেই একটা সুন্দর বাধাই করা সাঁকো আছে আর তার নীচের জলাশয়ে লাল কাঁকড়ার ও আরও অনেকরকম পোকামাকড়ের রাজত্ব।
সকাল বেলার ব্রেকফাস্ট সেড়ে আবার একটা টোটো নিয়ে আমরা বেরিয়ে পরলাম বকখালির দিকে। কারগিল ব্রিজ, ফ্রেজার গঞ্জ ও আরও কিছু যায়গা হয়ে আমরা পৌচ্ছোলাম বকখালি। সেখানে দুপুরের খাবার খেয়ে, সমুদ্রবক্ষে কাটালাম বেশ অনেকটা সময়। তার সাথে চললো কেনাকাটা আর বিভিন্ন সি-ফিস খাওয়া।
সমুদ্রে ভাটা চলছিলো, তাই জল ছিলোনা একেবারেই। তাই অনায়াসেই সমুদ্রের অনেকটা দূর পর্যন্ত চলে গেছিলাম আমরা। সমুদ্র ভ্রমন শেষ হলে, আবার আমরা গ্রামের মেঠো রাস্তা দিয়ে ফিরে গেলাম কটেজে। তখন সন্ধ্যে হতে আর কিছুক্ষণই বাকি, খুব তাড়াতাড়ি কেটে যাচ্ছিলো সময়গুলো, না চাইতেও তবু ফুরিয়ে গেলো আরও একটা দিন।
এখানকার পুরো জায়গাটার মধ্যেই একটা অন্যরকম মায়া আছে। আমার বারবারই মনে পরছিলো ছোটবেলায় পড়া সেই “হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’র” গল্পটা, যেন খুব চেনা লাগছিলো সবকিছু।
শনিবারের রাত কাটিয়ে পরের দিন রবিবার সকালে হেনরির সমুদ্র উপকূলে একটু ঘুরে, স্নান আর ব্রেকফাস্ট করে, আমরা গিয়ে পৌচ্ছোলাম বকখালি। সেখান থেকে বাসে করে আমরা আবার সবাই ফিরে এলাম কলকাতায়।
হৈ হৈ করে তিনদিন যে কিভাবে কেটে গেলো তা বোঝাই গেলো না। রবিবার বিকেলের মধ্যে আমরা আবার ফিরে আসলাম যে যার বাড়িতে। তবুও মন বারবারই ফিরে যেতে চাইলো সেই ফেলে আসা একচিলতে প্রকৃতির কাছে। ব্যস্ততার ঘেরাটোপে তাই একটুখানি শান্তির স্বাদ পেতে, এই “হেনরি আইল্যান্ড” আমার ডায়রির পাতায় আর এক নতুন সংযোজন।।
©দীপশ্রী গুহ
Comments
Post a Comment