ভাঙছে বিশ্বাস, বাড়ছে আতঙ্ক
সারাদিন টিভিতে খবরের সামনে বসে থাকতে থাকতে ভয়টা বোধহয় আর বিশেষ লাগছে না। কিংবা হয়তো আতঙ্ক নিয়ে চলতে চলতে ব্যাপারটা নেহাত লুডো খেলার মতো হয়ে যাচ্ছে, যখন তখন কেউ খেয়ে নেবে জেনেও খেলে যাওয়া।
তবে আমার ফ্রাস্ট্রেশনটা একটু অন্যরকম আসলে চিরকালীন সর্দি-কাশিতে জর্জরিত আমার নাক। আর যেহেতু কেটে বাদ দেওয়ার জোঁ নেই তাই এই নাক নিয়েই কবে আবার কাছের মানুষ গুলোকে জড়িয়ে ধরতে পারবো, সেই অনিশ্চয়তাটাই গলায় ফাঁসের মতো চাগাড় দিয়ে উঠছে রোজ-রোজ।
ভয় পাচ্ছি, তবে আশাহত বোধহয় নই। আজ দুপুরে খুব পরিচিত একজনকে জ্ঞান দিতে গিয়ে দেখলাম নিজের কাছেই পজেটিভ আর নেগেটিভ ভাবইস্ এর সংজ্ঞাগুলো কেমন সব হ,য,ব,র,ল হয়ে গেলো। তার কাছে অনেক কিছু শুনলাম বুঝলামও কিন্তু কোথায় এবং কিভাবে কাজে লাগাবো ধরতে পারলাম না। আমি তো এখনও এটাই বুঝে উঠতে পারছি না নাক মুছে, রুমালটা কোথায় রাখবো! আর নাক মুছে হাত ধোবো, নাকি হাত ধুঁইয়ে, নাক মুছবো? করোনা সাকস্!
যাইহোক তবে আমি কিন্তু দিব্য আছি। বেলা ১০ টায় ঘুম থেকে উঠছি, দুপুরে আবার ভাত ঘুম, কোনো তাড়া নেই জীবনে। সকালে লাইট জ্বালিয়ে কেউ ঘর মুছতে আসছে না, ৭টা বাজলে মা চিৎকার করে বলছে না ৯টা বেজে গেলো, বয়ফ্রেন্ডের সাথে চুটিয়ে ঝগড়া করেও মন খারাপ হচ্ছে না রাত ১টা পর্যন্ত সিনেমা দেখলে ভয় হচ্ছে না পরের দিন অফিসে টাইমে ঢোকা নিয়ে, বাসে পাশের ভদ্রলোকের ঘাম আর পারফিউম মেশানো অভিনব গন্ধগুলো শুকতে হচ্ছে না কিংবা কোন মাঝবয়সি কাকু’কে বলতে হচ্ছে না সরে দাড়ান আবার ট্রাভেল অ্যালাউন্সের ক্লেমের জন্য সব প্রাইস্ ডিটেলস্ও যত্ন করে গুছিয়ে রাখতে হচ্ছে না। মাঝেমাঝে শুধু ঘন্টা আর মোমবাতি জ্বালিয়ে টাক্স কমপ্লিট করছি আর পরের টাক্সের জন্য দিনগুনছি,যদিও আর সবার মতো এতে আমার আপত্তি নেই কারন “খাতরো কি খিলাড়ি” তে যাওয়ার তো সৌভাগ্য হবে না তাই একটু ফিল নেওয়ার চেষ্টা করছি মন্দ লাগছে না কিন্তু।
তবে গত ১৪ দিনের ঘরবন্দী জীবনে(আমি দুদিন আগে থেকেই বেরোচ্ছিলাম না। ) জীবাশ্ব গোছের কিছু স্মৃতি হঠাৎ করে ঘুরপাক শুরু করছে ঘিলুর মধ্যে। যেটা এর আগে কোনদিন গঙ্গার ঘাটে বসে কাউন্টার নিতে-নিতে কিংবা ছিলিম হাতেও মনে হয়নি। হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোকে কোনদিনই সেভাবে মিস করিনি বা মনেও পরেনি।
ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে দুপুরে পুকুরে পাড়ার সবাই মিলে সাঁতার কাটতাম, বিকেল হলে মাঠে খেলতে যেতাম, সাইকেল চালাতাম আর এইসব কিছুই হয়েছে বাবার হাত ধরে তবু কোনদিন থ্যাঙ্কস্ বলা হয়নি লোকটাকে যদিও একসাথেই থাকতাম সবাই। আর আজকে, দিনে ১০ ঘন্টা একসাথে কাটানো, পাশে বসা মানুষটার থেকে সামান্য “অগ্নিজেল” পেন ধার নিলে(কোনো বিশেষ কম্পানির প্রোমোশন করছি না মার্জনা করবেন। ) অথবা গাড়িতে লিফ্ট দিলে তাকে স্বতস্ফূর্তভাবে গুছিয়ে থ্যাঙ্কস্ বলাটা বাধ্যতামূলক থুড়ি এটিক্যেট। সন্ধ্যে হলে পড়তে বসে আত্মীয়স্বজন দের সামনেই বেদম মার খাওয়া, কিংবা পরীক্ষার পর কোশ্চেন পেপার এর সমস্ত উত্তর আওরাতে আওরাতে বাড়ি ফেরার মধ্যে যে কঠিন একটা এম্ব্যারেসম্যান্ট ছিল, সেটা আজকাল “লাভ ইউ” অথবা “মিস ইউ” এর পরিবর্তে “লাভ ইউ টু” বা “মিস ইউ টু” না বললেই অপর মানুষটির চোখে সহজেই ফুটে উঠছে কিংবা আরও খানিকটা বেশিও বোধহয়। (তবে আমি চিরকালই “হেট ইউ’’ তে বেশি বিশ্বাস করি।)
আজ সত্যিই মিস করছি। খুব মিস করছি এইসব কিছুকে। আবার খুব ভয় পেতে ইচ্ছে করছে, অঙ্ক না পারলে বাবার চোখ রাঙানিকে,ঝরের মধ্যে মার বকা খেয়েও আম কুড়োতে যাওয়া গুলোকে, হাত পা কেঁটে বাড়ি ফিরলে বকতে বকতে মা’র ওষুধ লাগিয়ে দেওয়াগুলোকে আর এরকম আরও অনেক হারিয়ে যাওয়া পুরোনো আমার আমি গুলোকে।।
পুনশ্চঃ হলুদ ট্যাক্সি টু ওলা এন্ড উবের সামহয়ার উই গ্রো আপ।।
©স্বাতীলেখা
Comments
Post a Comment