ষোল আনাই মিছে

আমরা তখন এ পাড়ায় নতুন, শ্যামলী আমাদের বাড়িতে ঠিকে কাজ করতো। আশেপাশেরও বেশ কয়েকটা বাড়িতে ঠিকে কাজ করে সংসার চালাতো। তবে ইদানিং আর করে না। বেশ কিছু বছর হলো ও একটা গেঞ্জির কারখানায় কাছ পেয়েছে, ২৩৫ টাকা রোজ। ওর স্বামী নেই, দুই মেয়ে নিয়ে কিছু দূরে একটা বস্তিতে থাকে। একমেয়ে পড়ে ক্লাস নাইনে, আর একজন উচ্চমাধ্যমিক দিচ্ছিলো, তবে এই লকডাউনে পরীক্ষা বন্ধ, তাই ঘরে বসেই দিন কাটছে ওদের। লকডাউনে শ‍্যামলীরও কারখানা বন্ধ, কবে খুলবে তারও কোন খবর নেই। লকডাউনে কাজে তালা পরলেও, পেটে তো আর তালা পরেনি। বরং আরও বেশি করে জাকিয়ে বসেছে খিদের  জ্বালা।
শ‍্যামলী আমাদের বাড়িতে এসেছিলো সেদিন। মা'কে ডেকে জিজ্ঞেস করলো, বাড়ির কিছু কাজ করে দিতে হবে কিনা। মা, কিছু করতে হবে না বলে, দেরাজ থেকে ৩০০ টাকা বের করে ওর হাতে দিয়ে বললো, - "এটা দিয়ে কিছু খাবার কিনে খাইয়ো মেয়েদের।"
আসলে এই করোনার প্রকোপে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষ গুলো, যারা হয়তো রোজ দু-পয়সা রোজগার করে, সম্মানের সাথে নিম্ন মধ্যবিত্ত হয়েই দিন কাটাচ্ছিলো।
আমাদের এলাকায় লকডাউনের জন‍্য, সবকটা পলিটিক্যাল পার্টি থেকেই ত্রানের ব‍্যবস্থা করেছে। পাড়ার ক্লাব থেকেও চাঁদা তুলে চলছে ত্রানের কাজ,কদিন পর-পর। সরকার থেকে আবার মাঝে-মাঝে গাড়ি করে এসে,খাবার দিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই কোনমতে একবেলা পেটভরে বা দুবেলা আধপেটা খেয়ে বেঁচে রয়েছে এলাকার এইসব মানুষ গুলো।

তবে গল্পটা এখানেই শেষ নয়। আসলে এই লকডাউনের জীবন কাটাতে কাটাতে সময়ের হিসেব রাখা হচ্ছে না একেবারেই। তাই হয়তো আশেপাশের ঘটে যাওয়া অহেতুক অনেক ঘটনাই মাথায় গেঁথে যাচ্ছে বিনা অনুমতিতে। যদিও অন্যসময় হলে বোধহয় ঘটনাগুলো পাত্তা পাবে না জেনে, নিজেরাই পাশ কাটিয়ে চলে যেতো। এরকমই প্রশ্রয়বিহীন পরপর দুটো ঘটনায় সংজ্ঞাহীন হলাম সেদিন-
আজকাল আমার বেশ দেরী করেই ঘুম ভাঙছে সকালে। জীবনে তাড়া না থাকলে যা হয়, সব কিছুই গদে বাঁধা নিয়মের বিপরীত গতিতে চলছে আজকাল। পরশু দিনও ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরিই হলো, ফ্রেশ হয়ে কফির কাপটা নিয়ে ঘরে এসে বসে, ল্যাপটপটা অন করলাম রোজকার মতো। পাড়ার ক্লাবে সেদিনও ত্রানের জন‍্য চাল-ডালের প্যাকেট বিলি করা হচ্ছিলো।ক্লাবের ছেলেরা আগে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে স্লিপ দিয়ে আসে, তারপর নির্দিষ্ট দিনে ক্লাব থেকে এসে প্যাকেট নিয়ে যেতে হয়। মেল চেক করতে-করতে হঠাৎ একটা হৈ-চৈ শুনে বারান্দায় এসে দাড়ালাম। পাড়ার ক্লাবটা আমাদের বাড়ির একদম উল্টোদিকেই। কফিতে চমুক দিতে-দিতে পুরো ঘটনাটা দেখে যা বুঝলাম-
একজন মহিলা স্লিপ পায়নি তাই এসে ঝামেলা করছে। ক্লাবের ছেলেরা বলছে, স্লিপ না থাকলে দেওয়া যাবে না কিছুই। আসলে ওদেরও তো কিছু করার নেই হিসাবের জিনিস, আবার একজন কে দিলে আরও লোক চলে আসতে পারে সেই সম্ভাবনাও একটা থেকেই যায়। এইসব নিয়ে একটা শোরগোল পরে গেছে ইতিমধ্যে। ক্লাবের বেশ কয়েকজন রাস্তায় দাড়িয়ে পুরোটা তদারকি করছিলো তারাও বোঝানোর চেষ্টা করছে সেই মহিলাকে। তবে সে কোনকিছুই বুঝতে নারাজ,আসলে খিদের জ্বালা এমনই হয়, কোনো কিছু বোঝার বা বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখেনা।
হঠাৎ শুনলাম একজন বলছে,
-বিশুদা ও বিশুদা, করবীকে তাড়িয়ে দিওনা ও তিনদিন কিছু খেতে পায়নি।
গলাটা চেনা ঠেকায়, বারান্দা থেকে উঁকি মেরে দেখলাম।
শ‍্যামলী দূর থেকেই স্লিপটা এগিয়ে দিয়ে বলছে,
-আমার প্যাকেটটা ওকে দিয়ে দাও বিশুদা। এই নাও আমার স্লিপটা।
আমি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম পুরো বিষয়টা, আর খুব আবাক হলাম শ্যামলীকে দেখে। সত্যিই এই অবস্থায়ও নিজের মুখের গ্রাসটা অন্যের মুখে তুলে দিতে দুবার ভাবলো না ও। অথচ এমন নয় যে, শ‍্যামলী নিজে তিনবেলা ভরপেট খেতে পাচ্ছে।
মনে মনে ভাবলাম এখনও এরকম মানুষেরা বেঁচে আছে বলেই হয়তো, দেশটা এখনো বিকিয়ে যায়নি।
এরপরই সাক্ষী হলাম আর একটা ঘটনার। সান্যাল বাবু, মানে বাসুদেব সান্যাল,রেলের বেশ উচু পোস্টে কাজ করতো একসময়। এখন রিটেয়ার করেছে, মেয়ের বিয়ে হয়েছে আগেই এবং বেশ সম্ভ্রান্ত পরিবারেই , আর এক ছেলে, সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বউ আর ছেলে নিয়ে স‍্যানাল বাবু পাড়াতেই একটা দোতলা বাড়িতে থাকে।
সেদিন দেখলাম দুই ব্যাগ ভরতি বাজার নিয়ে রাস্তা দিয়ে আর একজনকে বলতে বলতে যাচ্ছে,
-এতদিনে যা বুঝলাম, আগের সরকারই ভালো ছিলো। এই সরকার তো না খেতে দিয়ে মারবে যা দেখছি।
ক্লাবের বিশু সর্দার, ত্রানের দায়িত্বে ছিলো, স‍্যানাল বাবুর কথা শুনতে পেয়ে, দু-পাটি দাঁত বের করে,বিদরূপের হাসি হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলো
-কেন হে সান্যাল দা আপনার আবার কি হলো? এই তো দিব‍্যি ব্যাগ ভরতি বাজার করেছেন।
-আর বলো কেনো বিশু! এই দেখোনা, কথা নেই বার্তা নেই, ডি এ টা বন্ধ করে দিলো হঠাৎ করে। আসলে ওদের আর কি! সংসারের ঘানি তো টানতে হয় না, বুঝবে কি করে কত ধানে, কত চাল!

বিশু সর্দার যদিও উত্তর শোনার জন্য প্রশ্নটা করেনি সেটা বোঝাই গেলো, কারন প্রশ্নের উত্তরে স্যানাল বাবুর জবাব শেষ হওয়ার আগেই সে কোনো একটা দরকারে ক্লাবের ভিতরে ঢুকে গেলো তড়িঘড়ি। স্যানাল বাবুও বলা শেষ করে চলে গেলো বাড়ির পথে। তবে আমি বারান্দায় দাড়িয়ে পুরোটাই শুনলাম আর আমার আবার একবার চোখ গেলো স্যানাল বাবুর দু-হাতে দুটো ব্যাগের দিকে।
ততক্ষণে করবী বলে যে মহিলা ঝামেলা করছিলো, শ্যামলীর স্লিপটা নিয়ে তাকে দুটো প্যাকেট ধরিয়ে দিলো বিশু। আর শ্যামলী ওর খালি ব্যাগ, যেটা নিয়ে এসেছিল চালের প্যাকেট'টা নিয়ে যাওয়ার জন্যে, সেটা ভাঁজ করে বগলের তলায় নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হলো।
আমি তারপরে আরও কতক্ষন ওভাবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই, মা'র ডাকে হুশ ফিরলো।
আসলে, সমাজে "১২ আনা জীবন" ব‍্যার্থ হওয়া মূর্খ মাঝিরা ছিলো বলেই বাবুদের জীবনের, ১৬  আনার আক্ষরিক হিসেব সহজেই চোখের সামনে ফুটে ওঠে।।

Comments

Popular posts from this blog

স্রোত

বালির ঘর

গল্প কথা