ট্রান্সজেন্ডার
আমরা যারা নিয়মিত ট্রেনে,বাসে যাতায়াত করি তাদের কাছে এক বিশেষ মানুষের হাততালির শব্দ খুবই চেনা কিংবা পার্কের আঙিনায় অথবা সদ্যোজাতের বাড়ির দোরগোড়ায়, হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন আমি সেই মানুষ গুলোর কথাই বলছি যারা তথাকথিত “হিজরা”নামে ভূষিত।
দু-তিন বছর আগের কথা তখন সার্দান এভিনিউতে আমার অফিস ছিলো। ৫ টায় অফিস শেষে লেক গার্ডেন্স স্টেশন হয়ে ট্রেনে বাড়ি ফিরতাম, স্বভাবতই স্টেশন সংলগ্ন লেক’ই ছিলো রোজকার যাতায়াতের পথ। ৫:৩৫ এর বজবজ লোকালে শিয়ালদহ সেখান থেকে আবার নর্থ এর ট্রেন। অফিস থেকে লেকের দূরত্ব ৮ মিনিটের, তাই বাকি সময়টুকু লেকে বসেই কাটাতাম। অনেকরকম লোকের আনাগোনা দেখতাম, কেউ হাটতে এসেছে, কেউ বাচ্চাদের খেলাতে, একটা স্ট্রিট ডান্সের গ্রুপ ছিলো এইসব কিছুর থেকেও বেশী যারা ছিলো তা হল ভিক্ষারী তাদের মধ্যে কিছু জন ভিক্ষা করতো নেশায় আর কিছুজন পেশায়। তাই বেশ কিছুদিন পর মোটামুটি সকলেরই মুখ চেনা হয়ে গেছিলো। এরই মধ্যে একজন ছিলো মলি মাসী। বেশ স্বাস্থ্যবান,প্রায় ৫ফুট ৫ কিংবা ৬ ইঞ্চি লম্বা বছর ৭০-৭২ এর এক প্রৌঢ়া, পরনে রঙ চটে যাওয়া আর নোংরা সালোয়ার-কামিজ আর হাতে ১০ আর ২০ টাকার নোটের গোছা, একটা পা খোঁড়া, তাই সাথে পাঁচ-ছ’জন চ্যালা থাকে সবসময়। মাঝে-মাঝে এড়িয়ে যেতাম কখনো আবার ৫-১০ টাকা করে দিতাম। তবে পরের দিকে আলাপ হয়ে গেছিলো, তখন টাকা দিতে গেলে কেউ নিতো না। মলি মাসীই বলেছিলো একদিন- তুই এখানে পেটের দায়ে টাকা কামাতে আসিস আমিও তাই, এটাই আমাদের চাকরি, তাই তুই আর আমরা এক। বলেই সঙ্গে সঙ্গে জিভ কেঁটে বললো না-না একি আমি কি বলে ফেললাম! আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলো তুই আর আমি এক না কক্ষনো না, হতেই পারে না, কিছু মনে করিস না মেয়ে। আমি আস্বস্থ করে বলেছিলাম ‘কিছু মনে করিনি আমি মাসী’। মলি মাসী ছিলো ওখানকার হিজরা গোষ্ঠীর হোতা, আর একদিন প্রশ্ন করেছিলাম,
-তুমি কেন এত বয়সেও বেরোও?
উত্তরে মাসী বলেছিলো
-না বেরোলে খাবো কি? আর যদি না বেরোই হতচ্ছাড়াগুলো যে নিজেদের মধ্যেই কামড়াকামড়ি করে মরবে। আর ওদের দোষ দিয়েও তো লাভ নেই, ওদের তো আর কেউ বাসন মাজার ও কাজ দেবে না, পেটের দায়ে তাই চেয়ে বেড়াতেই হয়। কয়েকটার আবার বাড়ির লোক মাঝে-মাঝে তাদের ইচ্ছে মতো খাতির করে, না হলে আদ্দেকের দিকে তো ফিরেও চায় না।
আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম,
-সরকার থেকে তো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে শুনেছিলাম?
উত্তরে ডলি মাসি বলেছিলো,
-ওরে মেয়ে তুই যে হাসালি! নেতাগুলো নেতা হওয়ার আগে বেশ কিছুদিন তোয়াচ করে তারপরে আবার যে কে সেই। তাই বেঁচে থাকার থেকে মরণ’টা অনেক সুখের আমাদের জানিস তো ছ্যেমরি।
মনে পরছিলো গ্র্যাজুয়েসন এর দ্বিতীয় বছরে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির উদ্যোগে ফর্ম ফিলাপের সময় "ট্রান্সজেন্ডার" অপশনটা জেন্ডার কলাম এর মেল এন্ড ফিমেল অপশনের পাশে বসতে শুরু করেছিলো, কিছু কিছু সহপাঠী তা নিয়ে হাসাহাসিও করেছিলো বিস্তর।
দেরি হয়ে যেতে তাড়াতাড়ি উঠে পরলাম, ট্রেন মিস হলে আবার এক ঘন্টা পর। সেদিন ট্রেনে বসে ডলি মাসীর কথা গুলো মনে পরলো আর একবার তার সাথে আরও মনে পরলো ছোটবেলায় সম্প্রসারণ করতে গিয়ে একটা লাইন পড়েছিলাম বইয়ের পাতায়-
“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। ”
তাচ্ছিল্যতার হাসিটা সহসাই ঠোঁটৈর কোণায় ফুটে উঠল।
Comments
Post a Comment