হঠাৎ দেখা

“রেলগাড়ির কামরায়  হঠাৎ দেখা, ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন।। ”
কবিতাটা পড়তে পড়তে চোখের কোণাটা সামান্য চিকচিক করে উঠলো নীরার। প্রায় দশ বছর, দশ বছর বাদে চোখের সামনে আবার সিনেমার মতো ভেসে উঠলো পুরোটা।
- লঞ্চটা তখন হাওড়া ব্রিজের ঠিক নীচে। আচমকা বান আসলো নদীতে, লঞ্চটা পুরো কাত হয়ে যাচ্ছে একপাশে , নীরা চোখ বন্ধ করে, প্রানপণে সামনের লোহার হাতল'টা শক্ত করে ধরে আছে, বরাবরই জলে ভীষন ভয় ওর। হঠাৎই অনুভব করলো- ওর হাতের ওপর আর একটা পুরু হাতের স্পর্শ, বুঝতে সময় লাগলো না নীরার। এবার আস্তে আস্তে চোখ খুললো নীরা, কিছু বলার আগে আঙ্গিক বললো- ‘ভয় পাচ্ছিস কেনো আমি আছি তো!’ কিছুুক্ষন দুজনেই চুপ করে তাকিয়ে রইলো একে ওপরের চোখে। 

"-চেনা লোককে দেখলেম অচেনার গাম্ভীর্যে।।"

ধীরে-ধীরে নদী আবার শান্ত হলো।আঙ্গিক হাতটা কখন সরিয়ে নিয়েছিল, খেয়াল নেই নীরার। তবে সত‍্যিই সেদিন মনে হয়েছিলো হয়তো কেউ অন্তত আছে পাশে থাকার মতো, - সারাজীবন।।

আঙ্গিক আর নীরা সমবয়সী, কলেজে একই ডিপার্টমেন্ট, তবে ভালো বন্ধুত্ব ছাড়া আর কেউই কিছু উপলব্ধি করেনি গত তিনবছরে কখনও। দিনটা খুব সম্ভবত ২১শে জানুয়ারি ছিলো, কলেজের শেষদিন। দুজনেই ফেয়ারওয়েল শেষে বাড়ি ফিরছে। শোভাবাজার থেকে লঞ্চে হাওড়া সেখান থেকে ট্রেনে বালি। এটাই ছিল তাদের প্রতিদিনের রুট। প্রথম-প্রথম অসুবিধে হলেও পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল নীরার। আঙ্গিকের সাথে তাল মিলিয়ে আরও অনেক কিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলো নীরা। 

যদিও ওদিনের ওই বিষয়ে নিয়ে আর কিছুই বলেনি নীরা, তবে সত‍্যি বলতে, সেদিন একটা অন্যরকম উষ্ণতার অনুভূতি হয়েছিলো নীরার ! বুকের ভিতরটাও কেমন যেন ঢিব-ঢিব করে উঠেছিলো বারকয়েক, তিনবছরের খুব চেনা আঙ্গিক'কে অন্যরকম লেগেছিল সেদিন। বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে ঘুমিয়ে পরেছিলো নীরা। তারপর দেখতে দেখতে ফাইনাল পরীক্ষা এসে গেলো, যদিও এর মধ্যে বহুবার কথা হয়েছে আঙ্গিকের সাথে তবে সেটা শুধুই  পড়াশোনা আর স্বাভাবিক এবং নিয়মমাফিক কথাবার্তা। অবশেষে পরীক্ষা শেষ হলো। প্রায় বেশ কিছুদিন নিশ্চিন্ত জীবন কাটবে এবার। রেজাল্ট বেরোতে এখনও বেশ অনেকদিন বাকি। 

একদিন অনেকরাতে হঠাৎ আঙ্গিক ফোন করলো, ঘুমের ঘোরে ফোনটা ধরলো নীরা। আবারও কিছু বলার আগেই,ক আঙ্গিক ফোনের ওপার থেকে বললো - ‘বাকি জীবনটা এভাবে হঠাৎ-হঠাৎ তোকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেওয়ার জন্য পাশে থাকবি, আমার?’

কলিংবেলটা দু'বার বেজে উঠলে, হুঁশ ফিরলো নীরার। পুকির মা’কে দরজা খুলে দিয়ে, আবার ঘড়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে রইলো নীরা। ফুল স্পীডে ফ্যানের হাওয়ায় চুল গুলো উড়ছিলো তখন। নীরার মনে পড়লো ‘রাধিকা সংবাদ’ আবৃত্তি করলে, আঙ্গিক পাশে বসে নীরার কানের পাশের চুল গুলো ফুঁ দিয়ে বলতো- ‘জানিস রাধার চুলের প্রেমে পরেছিলো কৃষ্ণ, ঠিক আমার মতোই, তবে আমি কৃষ্ণ নই, তাই তোরও কোনো চাপ নেই।'

- আচ্ছা ভাবছি যে আমিও একটু আধটু কবিতা লেখা শুরু করি, কি বলিস? কেমন হবে ! তুই পড়বি তো নীরা আমার লেখা?

পুকির মা বিকেলের বাসন মেজে রান্নাঘর পরিস্কার করে, যাওয়ার সময় চিৎকার করে বলে গেলো- ‘দিদি! দরজাটা বন্ধ করে দিও, আমি চললুম গো।’ নীরা চুলে খোপা বাঁধতে বাঁধতে, উঠে এসে লক্ টা টেনে দরজাটা বন্ধ করে দিলো ।

কলেজের পর ১১ বছর সম্পর্ক ছিলো নীরা আর আঙ্গিকের, পড়াশোনা শেষ করে দুজনেই ভালো চাকরিতে জয়েন করেছিলো। তবে ওরা একসাথে থাকলেও বিয়ে করেনি কেউই, ওদের কখনও মনে হয়নি সব প্রেমের সম্পর্ককে পরিনতি দেওয়ার বা প্রতিষ্ঠার অর্থ বিয়ে।

তবে আজ এতবছর পরে এখন ওসব পুরোনো কাসুন্দি ঘাটা নেহাতই অর্থহীন, নীরা রান্নাঘরে দাড়িয়ে চা’য়ের জন্য জল গরম করতে করতে ভাবলো;
নীরা বরাবরই একটু জেদী আর একরোখা , এবং একটু বেশীই আত্মসম্মানবোধ তার। তাই যখন একদিন অফিস থেকে নীরার বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়া নিয়ে আবার ঝগড়া বাঁধলো দুজনের মধ‍্যে, আর ঝগড়ারার শেষে আঙ্গিক বললো - 'দেখ্ নীরা তোর সাথে থাকাটা নেক্সট টু ইমপসিবেল, তুই কোনদিনই শুধরাবি না তাই থাক তুই তোর জেদ নিয়ে আমার পক্ষে আর সম্ভব না তোর সাথে থাকা! '

সেদিন আর কোনো কথা বাড়ায়নি নীরা; সোজা ব্যাগ গুছিয়ে বেড়িয়ে এসেছিলো ফ্ল্যাট থেকে। তারপর প্রায় দশবছর। দশবছর কোনো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি কেউই, এরপর কোনদিন আর কোনো কথাই হয়নি কারোর। অভিমানের পাহাড় জমতে জমতে এখন প্রায় সবটাই শিথিল হয়ে গেছে নীরার কাছে, একা থাকতেও দিব‍্য পারদর্শী হয়ে উঠেছে সে। আসলে সবকিছু ভোলা সম্ভব না হলেও ধীরে ধীরে গাঢ়ত্ব টা অনেকটাই কমে যায়। দুঃখ নিয়ে কেইবা বাঁচতে চায়!

কিন্তু আজ এসব নতুন করে কেন মনে হচ্ছে তার, শুধু কালকের ঐ কিছুক্ষন সময়ে ওই চেনা পারফিউমের গন্ধটা নাকে আসার জন‍্য? নিজেকেই প্রশ্ন করলো নীরা, সত‍্যিই কি একটা সামান‍্য গন্ধ এভাবে নড়িয়ে দিতে পারে গত দশবছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা নতুন অভ‍্যেস সমন্বিত একটা আস্ত মানুষকে! মনে পড়লো আবার- গতকাল প্রায় দশ বছর পর হঠাৎ মেট্রোতে একটা পরিচিত গন্ধের সাথে মুখোমুখি হয়েছিলো নীরা, সময় থমকে গেছিলো মুহূর্ত্বের জন‍্য। অনেক প্রশ্ন, অনেক অভিমানের ভিড় জমা হচ্ছিলো, হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছিলো অচিরেই, প্রথমটা চুপ করে থেকে, নিজেকে আর চোখের জলকে সামলে নিয়ে ভিড় ঠেলে মেট্রোর দরজায় গিয়ে দাড়ালো নীরা, টালিগঞ্জে নামতে হবে। বাইরে বেরিয়ে স্মার্ট কার্ডটা ব‍্যাগে ভড়তে ভড়তে ৮বি-এর অটোর লাইনে দাড়ালো, অটোতে বসে ভাবলো আবার - হয়তো আঙ্গিকের সাথে আর দেখা হবে না কোনদিনই, কিংবা এভাবেই হয়তো কোনদিন ভুল করে ভুল রাস্তায়!

চা পাতা ডাষ্টবিনে ফেলে দিয়ে, আবার ঘরে ফিরে এলো নীরা, এয়ারপডে তখন বব মারলের সেই বিখ্যাত গান- "ডোন্ট ওয়াড়ি অ্যাবাউট আ থিঙ্ক, কজ্ এভরি লিল্ থিঙ্ক গোনা বি অল রাইট।" রবিবাসরীয় সন্ধ‍্যেয় চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে নীরা জোরে জোরে বললো আরও একবার-

'আমাদের গেছে যে দিন

একেবারেই কি গেছে –

কিছুই কি নেই বাকি?'


একটুকু রইলেম চুপ করে

তার পর বললেম

'রাতের সব তারাই আছে

দিনের আলোর গভীরে ।'

খটকা লাগল, কী জানি বানিয়ে বললেম নাকি ।

ও বললে, ' থাক এখন যাও ও দিকে ।'

সবাই নেমে গেল পরের স্টেশনে ।

আমি চললেম একা ।।

©স্বাতীলেখা

Comments

Popular posts from this blog

স্রোত

বালির ঘর

গল্প কথা