সফল আমি

রোজকার মতনই অফিসে অফিসে ঘুরে চাকরি না পাওয়ার ব্যর্থতা নিয়ে ভিড় বাসে বাড়ি ফিরছিলাম, হটাৎ করেই চোখে পড়লো রাস্তার ধারে একটা পোস্টার, তাতে বড়ো বড়ো করে কালো হরফে লেখা রয়েছে-

" ব্যর্থতাই, সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি।"  মাইকে ভাষন হচ্ছিলো, শুনে যা বুঝলাম, কাছেপিঠে কোথাও সাইকোলজিকাল ওয়ার্কশপের মতো কিছু একটা হচ্ছে। বাসে তিল ধারণের পর্যন্ত জায়গা নেই, তার ওপর গরমটাও জাকিয়ে পড়েছে। কোনোমতে হ্যান্ডেলটা ধরে সামনে একটা মহিলার উপরে প্রায় ঝুকে দাঁড়িয়ে আছি। আর জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। পোস্টারের লেখাটা তখনও চোখে ভাসছে, হঠাৎই মাথায় ভীড় করে এলো পুরোনো কিছু স্মৃতি। মনে পরলো,

-ছোটবেলায় একবার বাংলা ছাড়া অন্য কিছু পড়বোনা বলে জেদ করায়, মা'র কাছে কি বকাই না খেয়েছিলাম। আসলে বাংলাটা  চিরকালই ছিলো পছন্দের বিষয়, সহজেই বাক্যরচনা, টিকা এসব গুছিয়ে লিখতে পারতাম, মাঝে মাঝে দু-চার লাইন ছড়াও লিখতাম, তবে সেদিন মা'র চোখ রাঙানি আর বাবার ধমকের তলায় চাপা পড়ে গেছিলো 'কচি মনের কচি আহ্লাদ।'

নাচতে ভালোলাগতো খুব, একদিন মুখ ফুটে আবদার করেছিলাম-

"আমি নাচ শিখবো!"

শুনে, জ্যেঠি  বললো- 

"ওসব নাচ ঠাচ শিখে কাজ নেই। শশুরবাড়ি গিয়ে ধেই ধেই করে নেচে বেড়ালে লোকে কি বলবে, বরং গান শেখানো যেতে পারে।" 

শুরু হলো গান শেখা। হারমোনিয়াম নিয়ে কিছুদিন চললো, জব্বর টানাটানি। তারও কিছুদিন পর কাছেই একটা আঁকার স্কুলে ভর্তি করা হলো।পরিবারের সফল আবদারের ভীড়ে ঢাকা পরে গেলো নিজের ব্যর্থতার আবদারগুলো। ধীরে ধীরে বয়স বাড়লো আরও কিছুটা। প্রাইমারি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হলাম হাইস্কুলে, নতুন স্কুল, নতুন বৃত্ত। এরই মধ‍্যে ক্লাস সিক্সে ক্লাসটেস্টে ম্যাথসে করলাম ফেল। ছোটবেলা থেকেই ক্লাস এর প্রথম দিকের স্টুডেন্ট হওয়ায় এহেন ব্যর্থতায়, অসন্তুষ্ট সবাই, তর্জনী তুলে বুঝিয়ে দেওয়া হলো - 

'জীবনে ব‍্যার্থতার কোন দাম থাকতে নেই,

সফল হওয়া ছাড়া, অন্য কোন উপায় নেই।'

বন্ধ হলো গানের ক্লাস, আঁকার স্কুল, খেলাধুলা। নতুন অতিথি হিসেবে প্রবেশ করলো সাইন্সের প্রাইভেট টিউটর।

ততদিনে বেশ বুঝে গেছি জীবনে সফল হতে গেলে-

পড়াশোনায় হতেই হবে ভালো, নচেৎ উপায় নেই কোনো।

ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ নিছক ব‍্যর্থতা। তাই নিজের ব্যর্থতার গল্পদের বাক্সবন্দী করে চললো আরও বেশ কিছুবছর। পড়াশোনার চাপে, ক্রমে হারিয়ে গেলো, ছবি আঁকা, গল্পের বই, কবিতা পাঠ সবই। 

মাধ্যমিকে রেজাল্ট ভালো হওয়ায়, বাড়ি থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো আর্টস নয় সাইন্সই হবে পছন্দের স্ট্রিম। অগত্যা আবার গেলাম হেরে। সফলতার কাছে মুখ থুবড়ে পরতে হলো, ব্যার্থতা নামের ইচ্ছে খুশীর গল্পদের।

ইতিমধ্যে বাসে সামনের সিটটা খালি হলো। সিটে বসেই মনে পরলো, কিভাবে ফিজিক্সের ট্রিক্স জীবনে কোনোদিন মাথায় ঢোকেনি, অঙ্করা কোনদিন ফলপ্রসূ উত্তর বের করেনি, কেমিস্ট্রিতে সবসময়ই হারিয়ে যেতাম বেঞ্জিনের বেড়াজালে। আর বায়োলজির সায়েন্টিফিক নোমনক্লেচারকে হিব্রু ভাষার মতো লাগতো!

ফিজিওলজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম কলেজে। কলেজফেস্টে এক-দুবার স্টেজে দাঁড়িয়ে কবিতা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম, তবে ওইটুকুই। মাস্টার্স শেষ হওয়ার আগেই বাবা জানিয়ে দিলো এবার নিজের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই, সুতরাং চাকরির চেষ্টায় সরকারি থেকে বেসরকারি সব দরজাতেই ঢুঁ মারতে গিয়ে সুখতলা খয়ে গেলো। আর আরও একবার প্রমান হলো, গান লেখা, কবিতা বলা, শুধুই হবি বা প‍্যাশন হতে পারে এসব নিয়ে ব্যর্থতার গল্প হয়, সফল হতে গেলে মোটা মাইনের চাকরি আবশ্যিক। 

আগে খুব ঘটা করে বায়োডাটায় হবি অপশনটা রাখতাম, এখন আর রাখিনা।

এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফিরলাম, সাথে আরও একটা সন্ধ্যে, সবার চোখে ব্যর্থতার গল্প নিয়ে।

-আসলে সবার ফ্রাস্ট্রেশনের গল্পগুলো ব‍্যার্থতাদের নয়, 

কারোর জীবনে সফলতাগুলোই দমবন্ধকর হয়।।

Comments

Popular posts from this blog

স্রোত

বালির ঘর

গল্প কথা