সন্ধিক্ষণ
কবি আমি নই। সুতরাং লেখা ভাঙিয়ে পেট চালাবো এহেন দৌরাত্ম্য দেখাইনি কোনদিন আর সত্যি বলতে ভাবিওনি। তবে হ্যাঁ মাধ্যমিকে বাংলায় জেলায় প্রথম হওয়াতে স্কুলে বাংলার শিক্ষিকা সায়েন্স না নিয়ে আর্টস্ নেওয়ার জন্য বেশ জোড়াজুড়ি করেছিল। তবে তাতে বিশেষ একটা সুবিধা হয়নি কারন, বিজ্ঞানটা বরাবরই পছন্দের বিষয় ছিল। আর প্রথম বিভাগে পাশ করায় বাড়ির লোকেদেরও ওটাই মত ছিলো। কিন্তু সাহিত্য ছিলো চিরকালই ভালোবাসার বিষয়, কাছে টানার বিষয়। তবে অন্যান্য লেখক অথবা কবিদের মতো নিজের অব্যক্ত ভাব ব্যক্ত করতে আমি বিশেষ পটু নই। সর্বসাকুল্যে অনুরোধ এটুকুই যে, অন্যান্য কবি বন্ধুদের নিরিখে আমায় বিচার করতে গেলে পরিকল্পিত রসের সাগরে হাবুডুবু খাওয়ার আশা- বৃথাই থেকে যাবে। সুতরাং সেই দুঃসাহসীকতা কতটা দেখানো যুক্তিযুক্ত, তা আমার জানা নেই।
যাকগে আর বেশী কথার কচকচানিতে না গিয়ে আসল যে কথা বলার জন্য এত আয়োজন সেটা তবে শুরু করা যাক।
তিনবছর হলো আমার বিয়ে হয়েছে নীলাদ্রির সাথে। প্রায় ১৫ বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর সম্পর্কটা বিয়ে পর্যন্ত গড়িয়েছে। তাই যেহেতু দুজন দুজনকে বেশ অনেকটাই চিনি তাই আমাদের বৈবাহিক অন্তরদ্বন্দ্ব আর কলহ গুলো ওতো বেশীরকমের ক্ষতিকারক রূপে এখনো পর্যন্ত প্রমানিত হয়নি। আমি আর নীলাদ্রি দুজনেই ভালো চাকরি করি তাই সেই অর্থে আর্থিক দিক দিয়ে আমরা কারোর উপর নির্ভরশীল নই। মোটামুটিভাবে সুখী দাম্পত্য জীবনের সব রসদই আমাদের সম্পর্কে প্রতীয়মান। প্রায় ১৩ বছর হলো আমার চাকরি জীবনের। সুতরাং করপোরেট লাইফস্টাইলটা স্বভাবতই পরিচিত আমার কাছে। বসের চাউনি, অফিস পলিটিক্স, লোকাচার, মেকি ভদ্রতা ইত্যাদি-ইত্যাদি। আর শুধু জানাই নয় এইসব কিছুর মধ্যে থেকেও এসবের থেকে গা বাঁচিয়ে নিজের বৃত্ত তৈরি করার অক্লেশ প্রচেষ্টা ও ফলপ্রাপ্তি। সুতরাং অফিসের বাইরে অফিসের বিষয়গুলো এখন খুব একটা ভাবিয়ে তোলে না আর কারন, সে অভ্যেসও আমার শেখা হয়ে গেছে।
তবে ইদানিং যে বিষয়টা আমায় ভাবিয়ে তুলছে সেটা হল, - এতরকম জটিল আবরক দিয়ে তৈরি শৃঙ্খলের পরাকাষ্ঠা ভেদ করে বৃত্তের কিছু অংশে কিছু "অানসিন প্যাসেজে'র" হঠাৎ উদয়!
যে অঙ্কের উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না, কিংবা বলা ভালো, কোনো সূত্র দিয়েই হিসেব মেলাতে পারছি না। যে প্রশ্ন বারংবার উচ্চারন করলে একটা ক্লান্ত করে দেওয়া তীব্র শিরশীরানি পাকদন্ডী যোনি পথ বেয়ে নেমে এসে সাগরে মেশার অপেক্ষায় ক্রমশ জমা হতে থাকে কিনারায়।
কিন্নর রায়চৌধুরি। বরস ৪৫। জেনারেল ম্যানেজার। ১০ বছরের বিবাহিত জীবন। ছ’বছরের পুত্রসন্তান ও মা-বাবা নিয়ে হাওড়ায় ৩ কামরার ছিমছাম ফ্ল্যাটে সুখে বসবাস করে। উৎফুল্ল স্বভাবের বেশ মজাদার এক মানুষ। এই যৎসামান্য বিষয় ছাড়াও মানুষটির আরও বহুল বিষয়াদির বিস্তারিত বিবরণ আমার জানার তালিকাভুক্ত, যে জানার পরিধি ব্যক্তিগত অথবা বৃত্তিগত সব পরিসর কেই ছুঁয়ে গেছে। তবে সেসব উল্লেখের প্রয়োজন এখানে নেই।
-আমাদের আলাপ অফিসেই। যদিও আলাপ পর্ব টা মোটেও সুখকর ছিলো না, কারণ আমি বরাবরই নিজের বৃত্তের পরিধি অতিক্রম করিনা, তাই কেউ আমার বিষয়ে বেশী হস্তক্ষেপ কিংবা কৌতুহল দেখালে সেটা আমার বিশেষ পছন্দ হয় না কোনদিনই। আর তাই পরিচয়ের প্রথম পর্যায়টা বিরক্তি সূচকই ছিলো বলা চলে। তারপর ধীরে ধীরে বেশ খানিকটা সময় গড়িয়েছে। মানুষের চেনার অন্তরায়ও অনেকটাই কেটেছে। গল্প- আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে পেড়িয়েছে অনেকটা সময়ও। নতুনভাবে পুরোনো মানুষদের আবিষ্কার করার মতো একটা বিষদ স্বাদের অনুভবও হয়েছে। ঘৃন্যতা কেটে, বন্ধুত্বের হাতছানিও ঘটেছে।
এত অবধি সব কিছুই স্বাভাবিক মনে হলেও ইদানীং একটা ঝড় আমাকে নিরলসভাবে পেষণ করছে। উঠতে, বসতে, শুঁতে, জাগতে ক্রমাগত বুকে চাবুক মারর মতো বিঁধে চলেছে কিছু অমূলক ভাবনা। অনেকটা ঠিক জেগে স্বপ্ন দেখার মত। আর তার কেন্দ্রবিন্দু ঘিরে আছে যে ব্যক্তিটি তিনি কোনো অপরিচিত কেউ নন, কিন্নর রায়চৌধুরি। হ্যাঁ ঠিকই বলছি। যাকে শুধু ভালো বন্ধুদের ভিড়ে নিছকই এক অন্যরকম ভালো বন্ধু হিসেবে জানতাম এতদিন, সেই মানুষটা হঠাৎ কিভাবে এরকম অন্যভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করছে মনের অতল গভীরে, এই প্রশ্নটাই ক্রমে বিপাকে ফেলছে আমায়। ওঁর পারফিউমের সাথে সিগারেট অথবা ঘামের মিশ্রিত একটা মাতাল করা গন্ধ, যেটায় গাঁজার থেকেও বেশি নেশা লাগে আজকাল। লিফটে কিংবা ফ্লোরেও কাছাকাছি আসলে একটা অন্যরকম শীহরন অনুভূত হয়। মিটিং রুমে অথবা কাজের অাছিলায় একটু আধটু ছোঁয়াও ভূমিকম্পের মতো আমার সারা শরীর কাঁপিয়ে তোলে। ওর চোখের নিষ্পলক দৃষ্টিতে যেন জ্বলন্ত লাভার মত অতি উষ্ণতায় পুড়তে থাকি আমি। গাল ও কানের নরম পেশী ভিতরের উষ্ণতাকে ক্রমাগত বাইরে নিক্ষেপ করতে করতে রাঙা হয়ে তপ্ত হয়ে ওঠে। বাথরূমের নির্জনতায় যেন আরও বেশী করে আষ্টেপিষ্ঠে ধরে কিছু উষ্ণ ভাবনা, ফলে জলধারার অবাধ পতনে সিক্ত হয়ে কোনরকমে নিজেকে সামলে ফিরে আসতে হয় নিজের সিটে। ঘুমকাতুর রাতেরাও যেন আজকাল মুখ ফিরেয়ে নিচ্ছে আমার থেকে। এরকমই অতি ভয়াবহ অ-সুখের স্বীকার আমি আজকাল। অতি সাধারণ বন্ধুত্বের সম্পর্কে হঠাৎ এহেন বিপরীত ভাবনা ক্রমশ হতাশ করছে আমায়।
নীলাদ্রির সাথে সম্পর্ক সেই বয়ঃসন্ধিকালে। তখন পার্কের গভীরতায় বুকের উত্থান কিংবা গোপন গহ্বরে পুরু আঙুলের ছোঁয়া অথবা তারও কিছু পরে হোটেলের নির্জনতায় উন্মুক্ততার নিয়ম ভাঙার সময়ও নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপ ব্যতিরেকে এরকম কিছু অস্বাভাবিক অনুভব হয়েছিল, তবে সেটা ঠিক কিরকম তা এখন অতীত ঘেঁটে মনে করা সম্ভব নয় কারন বিগত এতবছরে নীলাদ্রির সাথে সম্পর্কের পরিধি এতটাই প্রসারিত, যে আব্রু ত্যাগের লজ্জা কিংবা বক্তব্য প্রকাশের কুণ্ঠা কোনটাই এখন আর নেই। তবে নীলাদ্রির সাথে আমার সম্পর্কটা, শুধুমাত্র বন্ধুত্বের তো ছিলোও না। আর এত বছরে কোন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের এতটা ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার ঘঠনা ঘটেনি ফলেই বার্ধক্যে পা ফেলার পূর্বমুহূর্তে এহেন স্বাভাবিক নিয়মের অস্বভাবী পারদের ওঠানামায় ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছি আমি, শক্ত তলের অভাবে।
যে তলিয়ে যাওয়া রাতের অন্ধকারে তারা খসার মতো, ক্রমে খসে পরছে নিজের পরিচিত দুনিয়া থেকে বহু দূরে।
এই নতুন নিজেকে চিনতে চিনতে যেন নিজেই হারিয়ে যাচ্ছি নিজের বেড়াঁজালের অন্ধকারে।
জানলার বাইরে তাকিয়েই ভাবতে লাগলাম- আমৃত্যু কি তাহলে এভাবেই আমায় বয়ে বেড়াতে হবে
আছড়ে পরা ঢেউ এর যন্ত্রনা, আর ক্রমে ভেসে যেতে হবে অথৈই কলঙ্ক সাগরে!
ভাবতে ভাবতে আরও একটা নির্ঘুম রাতের শেষ হয়ে, আলো ফুটলো আকাশের নীল জুড়ে।
Comments
Post a Comment