হ্যাপ্পি চিলড্রেন্স ডে
আমারক্ষেত্রে, ছোটবেলায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেটা সবসময়ই যেন একটা ধ্রুবক হিসেবে কাজ করে। সবসময়ই মনে হয়, সেই নিশ্চিন্ত শৈশবের দিনগুলোতে- যদি আবার ডুব দিতে পারতাম.....!
বহুদিন পর, আজকে হাতে একটু সময় পাওয়া গেছে, তাই এই পড়ন্ত দুপুরে জানলার পাশে বসে, অতীত স্মৃতিচারণা করতে করতে বহু ঘটনাই যেন চলচ্চিত্রের মতো হাতছানি দিয়ে যাচ্ছে অবলীলাক্রমে। সেরকমই ছোটবেলায় ফেলে আসা অনেকগুলি স্মৃতির মধ্যে যে ঘটনাটা খুব বেশী করে মাথায় আসছে সেটা হল-
গ্রীষ্মের এক ঘুমপাড়ানি দুপুর রোদে, আম চুরি করতে গিয়ে একবার কেলেঙ্কারি এক কান্ড ঘটিয়ে বসেছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমি ভীষন ডানপিটে রকমের ছিলাম। যথারীতি বকা খাওয়া কিংবা মার খাওয়াটা অন্যান্য নিত্যনৈমিত্তিক ক্রিয়াকলাপের মতই সাধারণ বিষয় ছিল আমার কাছে। তখন......, ক্লাস সিক্সে পরি। স্কুল ছুটি হতো সাড়ে তিনটেয়। জ্যৈষ্ঠের শুরু, সবে মাত্র আমে পাঁক ধরা শুরু করেছে। তবে বেশীরভাগই কাঁচা। আর কাঁচা আম নুন-লঙ্কা আর একটুখানি কাসুন্দি দিয়ে মেখে খেতে যে কী ভালো লাগে আমার! তা- ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না। রোজ স্কুল ছুটির পর আমি আর আমার দুই বন্ধু একসাথে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরতাম।
স্কুল থেকে একটু দূরেই একজনের বাড়িতে একটা কলমের আমগাছ ছিল। গাছটা বেশী বড়ো না তবু ফলন হতো প্রচুর। একদিন স্কুল ছুটির পর শুভক্ষণ দেখে, আমি, আমার দুজন সহপাঠীকে নিয়ে ছক কষে লেগে পরলাম আম চুরি'র কাজে। সবে মাত্র পাঁচিল থেকে পা উঁচু করে আম পারতে শুরু করেছি, তখনই ঘটলো ঘটনাটা।
এমনিতেই গ্রীষ্মের দুপুরে খেয়ে দেয়ে ভাতঘুমের চল, বাঙালির আজীবনের। তাই ওটাই ছিল মোক্ষম সুযোগ। বাড়ি ফিরতে দেরি হলে কি অজুহাত দিতে হবে তাও মোটামুটি সবার পরিকল্পনা হয়ে গেছিলো। যাইহোক, তিন-চারটে আম পারতে না পারতেই, ডাকাত পরার মতো হা-রে-রে-রে করে হুঙ্কার দিতে দিতে- "কে-রে,কে-রে" বলে লাঠি হাতে নিয়ে ছুটে আসতে শুরু করলো দশাসই চেহারার এক প্রাপ্তবয়স্ক ভদ্রলোক।
-ভদ্র বলছি ঠিকই তবে এ বিষয়ে সন্দেহের জট আমার কাটেনি। কারণ আমার মনে হয়েছিল ভদ্রলোক হলে নিশ্চই উনি কিছুমাত্র কটুক্তি না করে, বরং ছোট বাচ্চারা কষ্ট করে আম পারতে উঠেছে দেখে, হয়তো নিজেই আরও চার পাঁচটা আম হাতে দিয়ে সাবধানে গাছ থেকে নেমে বাড়ি ফিরে যেতে বলতো। তবে এসব কিছু হলো না। বাকি দুই বন্ধু লোকটিকে আসতে দেখেই ছুট মেরে কোথায় পালিয়ে গেলো। আর আমিও তাড়াহুড়ো করে পাঁচিল থেকে নামতে গিয়ে পরে গেলাম। ডান হাতের কনুই গেলো কেটে। বেশ অনেকটাই কেটে গেছিলো। মেয়ে বলে সে যাত্রায় বেঁচে বাড়ি ফিরলেও, পুরো ঘটনাটা শোনার পর যেটুকু তিরস্কার বাকি ছিলো তা সুদে-আসলে পুষিয়ে গেলো বাড়ির সবার বকা ও মারের আতিথেয়তায়।
এখন যদিও বয়স অনেকটাই বেড়েছে। বকা আর মারের উপদ্রবও আর নেই এখন। কিন্তু এই বড়বেলায় হাতছানি দেওয়া সব জটিল-কুটিল ফ্যাক্টরের, হিসেব মেলাতে মেলাতে ভুলেই গেছি যে, আমার পুরোনো আমিটাকেই আমি বাক্সবন্দী করে ফেলেছি। সেই সাবলীল শৈশববেলাকে ইচ্ছে করলেও আর ফিরে পাওয়া সম্ভব না। তবুও এই চরম সত্যিটা জেনেও, মাঝেমাঝেই ইচ্ছে করে, যদি সত্যিই টাইম মেশিনে চেপে আর একবারের জন্য ফিরে পেতাম সেইসসব রঙিন দিনগুলোকে, তাহলে মুঠোয় বেঁধে রেখে দিতাম চিরকালের জন্য। আর একটু একটু করে তাড়িয়ে তাড়িয়ে স্বাদ উপভোগ করতাম তার।।
Comments
Post a Comment