বৃষ্টিবরণ

বৃষ্টি বরণ 


রপোরেটের জটিলতা থেকে নিজেকে একটু স্বাধীন ভাবে পাওয়া যায় সাধারণত পুজোর কটা দিনেই, তাই মেঘলা প্রতিবছরই পুজো কাটাতে ঘাটশিলাতে দাদুর বাড়ি যায়। মামা নেই তাই দাদুর বাড়ি নামটাই বেশী প্রেফারেবেল। 
পুজোর কটা দিন সে কলকাতার জমজমাটি ব্যস্ততার ভিড় এড়িয়ে নিজেকে একটু একলা ভাবে খুঁজে পেতে  চায়, বছরের এই চারটে দিন সে একটু মাটির কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে, সোদা গন্ধ আর প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়া তাকে সারাবছরের মতো ডিটক্স করতে সাহায্য করে। 
সেবছর পুজো তে খুব বৃষ্টি হয়েছিল আর পুজো টাও শুরু হয়েছিলো সময়ের অনেক আগেই। সপ্তমী-অষ্টমী, শনি রবি হওয়ায় ষষ্টীতেই কলকতার পাট চুকিয়ে সে চলে এসেছে দাদুর বাড়ি। এমনিতেই জায়গাটা খুব মনোরম। সারি সারি গাছ, ধু-ধু মাঠ, বিঘা-বিঘা ধানে ভরা জমি। এমনিতেই একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়। অনেকটা ঠিক মেরিটেশান গোছের। 
বাড়ির পাশেই একটা প্রকান্ড মাঠ, সেখানেই হয় দূর্গাপুজোর আয়োজন। 
এমনিতে পুজো-আচ্ছা না করলেও পুজোর কটা দিন রোজ সকালে উঠে স্নান সেরে নতুন কাপড় পরে অঞ্জলি দেয় মেঘলা। সেবছরও অষ্টমীর দিন শাড়ি, গয়না পরে রেডি হয়ে বসে আছে, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে চলছে, আর মাইকে ক্রমাগত মন্ত্রপাঠ উচ্চারিত হচ্ছে। 
-“বৃষ্টিটার সত্যিই আক্কেল জ্ঞান এক্কেবারে নেই, এভাবে সারাদিন অনবরত হয়েই চলছে, একটু তো বিরাম দিতে পারে। যেন দায়িত্ব নিয়েছে এবারে পুজো'টা পন্ড করার।” এসব ভেবেই খুব রাগ হতে লাগলো মেঘলার। কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টিটা একটু কমতে সে রওনা দিলো, 
দাদু-দিদাকে “আসছি” বলে,
পাশেই সিড়িঁর রেলিং এ রাখা ভেজা ছাতটা নিয়ে চলে গেলো, বিক্রম বাবু, মানে মেঘলার দাদু  একটু আগেই বাজার থেকে ফিরলো তাই ছাতাটা ওখানে ছিলো মেঘলা কনোমতে শাড়ি ছাতা আর নিজেকে সামলে, গিয়ে পৌচ্ছালো প্যান্ডেলে। বেশ নাকালই হতে হয়েছিল ও’কে সেদিন, বাড়ি থেকে প্যান্ডেলের ওই সামান্য রাস্তাটুকু অতিক্রম করতে।
 -আজকে শাড়ি পরার ডিসিশানটা ঠিক হয়নি একদম! মনে মনে ভাবলো মেঘলা।ছাতাটা বন্ধ করে ভীতরে ঢুকলো সে। প্রচুর লোক সবাই অঞ্জলি দেবে। তারইমধ্যে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাড়ালো ও।  দুবার অঞ্জলি হয়েছে এই নিয়ে তিন নম্বর কিন্তু মনে হচ্ছে এবারও সুযোগ হবে না।  তাই এবারও অপেক্ষা করলো। এদিকে খিদেও পাচ্ছে, তাই উপায়ও নেই। ভীড় ঠেলে এগোতেই হবে তাকে। তাই পা বাড়ালো এবার, বহু কসরত করে চতুর্থবার সুযোগ হল অঞ্জলি দেওয়ার। তিনবার অঞ্জলির বিধি শেষ করে, চরনামৃত নিয়ে মাথায় হাত মুছে নিলো মেঘলা। জুতো পরে ছাতাটা যেখানে রেখেছিলো সেখানে গিয়ে ছাতাটা নিলো। ততক্ষণে প্যান্ডেল আর মাঠে জল জমে গেছে পাড়ার ছেলেরা সেই জল ফেলতে তাড়াতাড়ি নেমে পরলো কাজে। 
দুহাতে শাড়িটাকে উঁচু করে ধরে এগোতে লাগলো কিন্ত বৃষ্টি তখনও পরেই চলেছে তাই একহাতে ছাতাও ধরতে হবে। এসব ভাবতে ভাবতে সে এগোতে লাগলো, হঠাৎ পাশ থেকে একটা ভারী বেশ রোমাঞ্চকর পুরুষালী গলার আওয়াজে ঘুরে তাকালো মেঘলা, 
-“আপনার অসুবিধা না হলে ছাতাটা আমি ধরতে পারি, আপনি বোধহয় বিক্রম জ্যেঠুর নাতনী। আমিও ঐ রাস্তায় যাবো, আপনি চাইলে আসতে পারেন আমার সাথে। ” 
- প্রায় একনাগারে বলে গেলো সেই অপরিচিত লোকটা। 
হ্যাঁ মানে মেঘলার কাছে অপরিচিত তো বটেই তবে সে তো মেঘলাকে ভালোই চেনে বলে মনে হচ্ছে। মেঘলা কিছুক্ষন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো লোকটার দিকে, বেশ পুরুষালী চেহারা তার। চোখ, নাক বেশ টিকালো। গায়ের রং একটু মাজা, বেশ পাঁকানো ঘন গোঁফ। দেখলেই কেমন একটা শিহরন হয়, মুগ্ধতা আর গলা পর্যন্ত আবেগ বশেই হয়তো মেঘলা এমনই আরও কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো তার দিকে, কথা বলতে পারলো না সে।  
-না এ চেহারা তো সে আগে কোনদিনও দেখেনি কই না তো এতো বছরে সে একবারও দেখেছে বলে তো মনে পরছে না। লোকটা কি সুযোগ নিতে চাইছে! -ভাবলো মেঘলা। ততখনাৎ বাইরে ঠান্ডা হাওয়ায় সমস্ত শরীরে একটা শান্ত আবেশ খেলে গেলো, কিছু চিন্তা মাথায় আসার আগেই বোধহয় উড়ে গেলো হাওয়ায়।
-“নমস্কার আমি আকাশ, আকাশ সেন।  বছরের বাকি দিন গুলো কলকাতায় থাকি। শুধু পুজোর চারটে দিন এই ঘাটশিলার মনোরম দেশে আমায় খুঁজে পাওয়া যায়। কলকাতায় যাদবপুরের কাছে আমার নিজেস্ব একটা ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে, আমি ওখানকার অন্যতম একজন কোচ ও বটে।” পরিচয় পর্ব শেষ হতেই, মেঘলা বলে উঠলো
-বাহ্! 
এর বেশি আর কিছুই বলতে ইচ্ছে হলো না ওর। হয়তো শুধু শুনতেই ইচ্ছে করলো, কোনদিনই আগ বাড়িয়ে কিছু বলার বা জানার বাড়াবাড়ি ছিল না মেঘলার। তবু কেউ কিছু বললে সে চিরকালই ভীষন মন দিয়ে শোনে। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হল না।
শেষমেষ একটা ছাতাতেই বাড়ি ফিরলো দুজনে। এই প্রথম কোন অচেনা পুরুষের এতটা কাছাকাছি ছিলো মেঘলা। তাকে বাড়ি পর্যন্ত পৌচ্ছে দিয়ে আকাশ নিজের রাস্তা ধরলো।  মেঘলা ধন্যবাদ জানিয়ে তাকে বিদায় দিলো।  হয়তো আরও একটু আতিথেয়তা প্রাপ্য ছিল তার তবে ইচ্ছে করেই বোধহয় সেটা করতে চাইলো না মেঘলা, পাছে যদি সুযোগ পেয়ে বসে। আকাশ কিছু মনে করলো কিনা সেটা দু-একবার ভাবার চেষ্টা করলো মেঘলা, তবে বেশী পাত্তা না দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল ও। পরদিন নবমী। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে, চতুর্দিক্ কাদা-কাদা হয়ে আছে। বিকেলের দিকে মেঘলা বিক্রম বাবু আর মায়া দেবী মানে মেঘলার দিদা, তিনজনে একবার প্যান্ডেলে গেল।  মায়া দেবীর বাতের ব্যাথায় হাঁটতে বেশ কষ্ঠই হয়। প্যান্ডলে পৌচ্ছে মেঘলা দু-তিনবার এদিক ওদিক ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখে নিল, অচেনার ভীড়ে যদি হঠাৎ করে হাতছানি পাওয়া যায় কোনো চেনা মানুষের! তবে সে আশা বৃথাই হলো।
সন্ধ্যের আরতি দেখে ওরা বাড়ি ফিরলো। ফেরার সময়’ও দু-তিনবার পিছনে তাকালো মেঘলা।
 -নাহ্ কেউ নেই! 
পরদিন দশমী সকালে বিসর্জন বিধি শেষ হলে, একবার দেখা পাওয়া গেলো আকাশের, মেঘলা কে দেখে এগিয়ে আসলো সে। বোধহয় এরকমই হয় মেয়ের নেশা, সবাই এগিয়ে এসে কথা বলতে চায়, আলাপ করতে চায়। তাই হয়তো মেয়েরাও অনায়াসে সবসময়ই নিজেদের আত্মঅভিমানটা ধরে রাখতে পটু। তবে একথাও পুরোপুরিভাবে অস্বীকার করা যায় না যে, সেদিন মেঘলার কোনরকম ইচ্ছে ছিল না আকাশের ঘনিষ্ঠতা পাওয়ার, মনের মধ্যে সে’ও তো পাততে শুরু করেছিলো রঙিন চাদর। 
কিছু হাসি আদানপ্রদান, আর শেষে কে কবে ফিরবে এসব বলেই শেষ করলো তারা সেদিন। মেঘলা ভেবেছিল আজও হয়তো পাশে সঙ্গী’টি অটুট থাকবে, তবে আজ আর সেটা হল না, তাই সঙ্গীহীন মেঠো পথ ধরে বাড়ি ফিরে এলো ও। আকাশ ওর ছোটবেলার পরিচিত বন্ধুদের সাথে কোথায় একটা গেল। বিজয়াদশমীর কুশল বিনিময় শেষ করে আকাশ চলে গেছিলো সেদিন, তবে কিছু কিছু বিদায়কাল না এলেই বোধহয় আর একটু ভালো হয়। 
দুপুরে খাওয়া-দওয়া সেরে একটু গড়িয়ে নিলো সবাই। এখানে কলকাতার মতো সন্ধ্যে হলেই দলবেঁধে ঠাকুর দেখতে যাওয়া কিংবা কোলাহল এর আড়ম্বর নেই। তাই ওরা ঘুম সেরে সন্ধ্যে বেলা, তিনজনে চা আর মুড়ি মাখা খেতে খেতে গল্প করতে বসলো। সুযোগ বুঝে মেঘলা বিক্রম বাবুকে একবার আকাশের কথা জিজ্ঞেস করেই ফেললো, বোধহয় মনে মনে মেঘলা আকাশের ব্যাপারে কৌতুক ছিলো তবে পাছে স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করে নিজের কাছেই নিজে ধরা পরে যায় সেই দ্বন্দ্বেই এই কদিন সে কিছু বলতে পারেনি। 
বিক্রম বাবুর ছোটবেলার বন্ধু রবীন সেনের নাতি, আকাশ সেন। বড় ভালো ছেলে, এটুুকু বলে বিক্রম বাবু শেষ করলেও তাতে মন ভরলো না মেঘলার, তার আরও কিছু জানতে ইচ্ছে হল তবে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না ও। 
কাল ভোরের ট্রেন আবার নতুন জীবনে ফিরতে হবে তাকে, পরশু থেকে অফিস জয়েন করবে। তবে তার যাওয়ার কিঞ্চিৎ মাত্রও ইচ্ছে নেই। রাতে শুয়ে শুয়ে মেঘলার বেশ কয়েকবার মনে পরলো আকাশের কথা। তার সহাস্যমুখ, তার চাউনি আরও কত কিছু, যা দিয়ে স্বপ্নের একটা মস্ত ছাদ গাঁথা হয়ে যায়।
তবে প্রতিবছরই অষ্টমীর দিনটা মেঘলার মনের আকাশে একটা অন্যরকম হুতাশ কাজ করে। আকাশের সেই প্রানোচ্ছল চোখ যেন আজও মেঘলার অভ্যন্তরে চেয়ে আছে। ঘন মেঘের আড়াল থেকে তার সর্বাঙ্গ লেহন করে চলেছে অশ্লেষে, আবেগে, মুগ্ধতায়।

Comments

Popular posts from this blog

স্রোত

বালির ঘর

গল্প কথা